জেনোবিয়ার কথা : পালমিরার রাণী

আজকে সিরিয়া বলতে আমরা যে যুদ্ধবিধস্ত যে দেশটা বুঝি, ঠিক সেখানেই ২৬৭ সালে রোম শাসিত পালমিরা রাজ্যে হঠাৎ করে উত্থান ঘটেছিলো এক প্রতাপশালী সম্রাজ্ঞীর। জেনোবিয়া নামে সদ্য ত্রিশের ঘর পেরোনো সেই নারীর নেতৃত্বে সিরিয়া এবং তার আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে তুলেছিলো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু বিশাল এক সাম্রাজ্য।

প্রাচীন পালমিরা রাজ্য

03palmyra.adapt.768.1
একটা সময় এই পালমিরা ছিলো শামের অন্যতম বাণিজ্য নগরী

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে শাম অঞ্চলে বাণিজ্যের কেন্দ্র হতে শুরু করে পালমিরা। ইউরোপ থেকে শুরু করে চীন, এমনকী ভারত থেকেও ব্যাবসার কাজে এই বন্দরে এসে ভীড় করতেন বণিকরা। খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয় রাজ্যটি।

কিন্তু রোমানদের কাছে আর দশটা অধীন রাজ্যের থেকে পালমিরার মর্যাদা ছিলো কিছুটা ভিন্ন। তখন এশিয়ার সাথে রোমের যোগাযোগের একমাত্র রুট ছিলো এই পালমিরা। এছাড়া পারস্য সহ আশেপাশের রাজ্যগুলির বিদ্রোহ ঠেকাতে পালমিরার সামরিক সাহায্যও প্রয়োজন ছিলো রোমান সম্রাটের। তাই নিজেদের স্বার্থেই সমস্ত কর মওকুফ করে এবং এর শাসককে ‘রাজা’র সম্মান দিয়ে পালমিরাকে কার্যত স্বাধীন করে দিয়েছিলো রোম। এবং এর প্রতিদানে আশেপাশের সমস্ত এলাকায় বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে পারস্য ও শামে রোমানদের একচ্ছত্র আধিপত্য  বজায় রেখেছিলেন পালমিরার রাজা ওডেনেইথাস।

তবে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, ২৬৭ সালে এক সামরিক অভিযান থেকে ফেরার পথে আততায়ী হামলার শিকার হয়ে মারা পড়েন ওডেনেইথাস। সেই অভিযানে রাজার সঙ্গী হয়েছিলেন যুবরাজ। পিতার সাথে তিনিও প্রাণ হারান এই হামলায়।

রাণী মাতা

Zenobiaওডেনেইথাস এবং তার বড় ছেলের মৃত্যুর ফলে ক্ষমতার দণ্ডটি চলে যায় তার ছোট ছেলে ভাবালাথুসের কাছে। কিন্তু তার বয়স তো দশ পেরিয়েছে মাত্র, এই বিশাল রাজ্য এই বাচ্চা ছেলেটি চালাবে কিভাবে! কোনো উপায়ান্তর না দেখে শেষমেশ ছেলের পক্ষে শাসনভার তুলে নেন তার মা জেনোবিয়া।

হঠাৎ করেই অন্দরমহল থেকে সোজা ক্ষমতায় বসে যাওয়া জেনোবিয়ার বংশ বা পরিবার সম্পর্কে খুব বেশী কিছু জানা যায়না। ধারনা করা হয় স্থানীয়  এক অভিজাত পরিবারে জন্ম ছিলো তার। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে মায়ের দিক থেকে ক্লিওপেট্রার বংশধর বলে দাবী করেছেন। যাহোক, জেনোবিয়ার অভিষেকের ফলে পালমিরায় তখন সিংহাসন নিয়ে যে উত্তেজনা চলছিলো, তার আপাত অবসান ঘটে।

মিশর থেকে আনাতোলিয়া

zenobia_of_palmyra__273_ad___women_war_queens_by_gambargin-d7oo57y
জেনোবিয়ার হাতে পতন ঘটে মিশর, সিরিয়া, লেবানন সহ রোম শাসিত প্রায় গোটা আরবভূমি

ওডেনেইথাসের আমলে পালমিরার সাথে রোমানদের যে বোঝাপড়ার সম্পর্ক চলছিলো, জেনোবিয়ার ক্ষমতায় বসার এক বছরের মধ্যেই তার উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। গথদের সামলাতে রোমানদের তখন রীতিমতো হিমশিম খাওয়ার অবস্থা। ফলে সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো ভাবেই আরবের দিকে নজর দেয়ার ফুসরত ছিলো না তাদের। এই সুযোগটাকেই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন পালমিরার রাণী। রোমান আধিপত্য পুরোপুরি অস্বীকার করে পালমিরাকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে ঘোষনা দেন তিনি। আর এর পরেই শুরু হয় রোমান অনুগত শাসকদের বিরুদ্ধে তার বিখ্যাত সামরিক অভিযান।

২৬৯ সালে জেনোবিয়ার নেতৃত্বে মিশর অবরোধ করে পালমিরার সেনারা। এক দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর রোম শাসিত দেশটির পতন ঘটে। পালমিরা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় মিশর এবং নিজেকে ‘মিশরের রাণী’ ঘোষণা করেন জেনোবিয়া।

মিশর দখলের পর জেনোবিয়ার সামরিক অভিযানের তালিকা আরও বিস্তৃত হয়। এক বছরের মাথায় অর্থাৎ ২৭০ সালের মধ্যে পালমিরা পরিণত হয় বিশাল এক সাম্রাজ্যে। একের পর এক অভিযানে সিরিয়া, লেবানন এবং মিশরসহ আরব এবং এশিয়া মাইনরের এক বিস্তীর্ণ এলাকা চলে আসে তাদের অধিকারে। কথিত আছে, ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাণী জেনোবিয়া নিজে অংশ নিতেন এইসব যুদ্ধে। আর দশজন যোদ্ধার সাথে পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিতেন মাইলের পর মাইল পথ।

একটা পর্যায়ে তুরস্কের আঙ্কারা পর্যন্ত পৌঁছে যায় পালমিরার পতাকা। ইউরোপে তাদের প্রবেশ সময়ের ব্যাপার মাত্র। রোমানরা বুঝতে পারে এখন আরবের দিকে নজর দেয়ার সময় হয়েছে।

1c8ebc340cd537a4f4423bdfde227511
পালিমিরা সম্রাজ্য

অরেলিয়ানের অভিযান

urelian
সম্রাট অরেলিয়ান

এদিকে রাণী জেনোবিয়া যখন তার সাম্রাজ্য বাড়ানোর জন্য একের পর এক যুদ্ধ বিগ্রহ করে বেড়াচ্ছেন আরব জুড়ে, ঠিক তখন রোমানরা ব্যস্ত নিজেদের ঘর গোছানোর কাজে। ২৭০ সালে সম্রাট ক্লডিয়াসের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সামরিক কমান্ডার অরেলিয়ান। ক্ষমতায় বসেই নতুন সম্রাট বেরিয়ে পড়েন বেদখল হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলো দখল করতে। পরবর্তী দুই বছরের ভেতর ইউরোপে হারানো কর্তৃত্ব ফিরে পায় রোম।

২৭২ সালে পালমিরার দিকে নজর দেন আরেলিয়ান। ততদিনে রোমানদের ব্যবসা বাণিজ্য লাটে উঠেছে। মিশর থেকে আর গম আসছে না ইউরোপে। রোমানদের জন্য আরব এবং এশিয়ায় যাওয়ার পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন রাণী জেনোবিয়া। আর নিজের সম্রাজ্যে ছেলের নামে নতুন মুদ্রাও চালু করে দিয়েছেন তিনি। সব দিক বিবেচনা করে অরেলিয়াস ঠিক করলেন এবার আরবে অভিযান চালাবেন তিনি। পত্র মারফত জেনোবিয়াও জানিয়ে দিলেন রোমান আগ্রাসন মোকাবেলা করতে তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত। অবশেষে বর্তমান তুরস্কের অ্যান্টিওচ শহরে এসে মুখোমুখি হয় এই দুই পক্ষ।

পিছিয়ে আসার কৌশল

zpage003পালমিরিনদের মূল শক্তি ছিলো তাদের তীরন্দাজ ইউনিট। বিষাক্ত শর দিয়ে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করতে পারতো তারা। যে কারণে নিজেদের তুলনায় আয়তনে বড় সেনাবাহিনীকেও হারিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ছিলো তাদের, এমনকি রোমান বাহিনীকেও। সামরিক কমান্ডার হিসেবে অরেলিয়াস খুব ভালোভাবেই জানতেন সেটা। তাই তীরন্দাজদের এড়াতে একটা বুদ্ধি আঁটেন তিনি।

প্রতিটি সামরিক বাহিনীতে অশ্বারোহী ইউনিট সবসময় থাকে সামনের সারিতে। তার পেছনে পদাতিক আর সবশেষে তীরন্দাজরা। অন্যদের তুলনায় গতি বেশী হওয়ার কারণে পেছনের ইউনিটগুলোর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায় অশ্বারোহী যোদ্ধাদের ভেতর। এই বিষয়টাকেই কাজে লাগান অরেলিয়াস। যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যের তিনি পিছু হটতে নির্দেশ দেন রোমানদের। পালমিরিনরা এটাকে দুর্বলতা ভাবলেও আসলে অরেলিয়াসের উদ্দেশ্য ছিলো শত্রুপক্ষের তীরন্দাজদের নাগালের বাইরে আসা। টোপ গিলে ঠিকই তাদের পিছু নিতে শুরু করে পালমিরার অশ্বারোহীরা।

তীরন্দাজদের নাগালের বাইরে আসতেই সেনাপতির নির্দেশে ঘুরে দাঁড়ায় রোমানরা, তাদের এই আচমকা ঘুরে দাড়ানোর ফলে মুহুর্তেই ভেঙ্গে পড়ে পালমিরিনদের ফ্রন্ট লাইন। আর নিমেষেই বিজয়ের উল্লাস পরিণত হয় পরাজয়ের গ্লানিতে। রোমান সৈন্যদের পালটা জবাবে গুড়িয়ে যায় পালমিরার শেষ প্রতিরোধ। সত্তর হাজার সেনা নিয়ে কোনোমতে পালিয়ে এমিসার দিকে রওনা দেন জেনোবিয়া।

পালমিরার অবরোধ

Herbert_Schmalz-Zenobia
হারবার্ট গুস্তাভোর তুলিতে পালমিরা অবরোধের দৃশ্য : ছবিটি সংরক্ষিত আছে এডিলেডের আর্ট গ্যালারীতে

এমিসাতে পৌছেও আর এক প্রস্থ যুদ্ধ হয় দুপক্ষের ভেতর। এবং এবারও সেই একই ভুল, এবং একই ভাবে পরাজিত হন জেনোবিয়া। সামান্য কিছু যোদ্ধা নিয়ে পালমিরা শহরে ফেরত আসতে সক্ষম হন তিনি। কিন্তু অরেলিয়াস তো ছেড়ে দেয়ার বান্দা নন, রাণীর পেছন পেছন তিনিও এসে উপস্থিত হন এখানে। এবং তার বাহিনীকে নির্দেশ দেন গোটা শহরটা ঘিরে ফেলতে।

আগে থেকে অবরোধের প্রস্তুতি না থাকায় কিছুদিনের ভেতরে খাদ্য সংকট দেখা দেয় পালমিরা শহরে। এই পরিস্থিতিতে দুপক্ষ থেকেই সমঝোতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো একবার, কিন্তু জেনোবিয়া নিজের সিংহাসনের দাবীতে অনড়। তিনি কিছুতেই রোম সম্রাটের আনুগত্য করবেন না।

অবশেষে যেকোনো উপায়ে শহরটিতে প্রবেশ করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন অরেলিয়ান। আর নিশ্চিত পরাজয় টের পেয়ে কৌশলে রোমানদের নজর এড়িয়ে পালমিরা থেকে বের হতে সক্ষম হন জেনোবিয়া। একটি উটের পিঠে চড়ে পুত্রসহ রানী রওনা দেন পারস্যের দিকে। পারস্যরাজের সহায়তা নিয়ে পালমিরাকে মুক্ত করার আশা করেছিলেন সম্ভবত।

কিন্তু পারস্য পৌঁছানোর অনেক আগেই ব্যুহ ভেঙ্গে পালমিরাতে প্রবেশ করে রোমান বাহিনী। গোটা শহরটি পরিণত হয় ধ্বংশস্তুপে, আর পালিয়ে যাওয়ার খবর জানতে পেরে জেনোবিয়াকে ধরার জন্য বিভিন্ন দিকে সেনা পাঠান অরেলিয়াস।

অবশেষে ফোরাত নদীর তীরে পুত্রসহ রোমানদের হাতে ধরা পড়েন রানী জেনোবিয়া। আর পালমিরা ও মিশর সহ জেনোবিয়ার অভিযানে পতন হওয়া প্রতিটি রাজ্যে অনুগত শাসকদের বসিয়ে রোম অভিমূখে রওনা দেন বিজয়ী সম্রাট অরেলিয়ান।

হারিয়ে যাওয়া

ধরা পড়ার পর জেনোবিয়ার ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তা আর জানা যায়নি। হয়তো তার প্রাণদণ্ড হয়েছে অথবা বন্দী অবস্থাতেই মারা গেছেন। একটা বর্ণনায় এসেছে তার রূপে মুগ্ধ হয়ে অরেলিয়ান তাকে মুক্ত করে ইতালির একটি শহরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তবে এসব কিছুই অনুমান নির্ভর কথা, কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি তার পরিণতি।


রাণী জেনোবিয়ার পতনের পর আবার রোম শাসন শুরু হয় পালমিরাতে। কিন্তু বিধ্বস্ত এই শহরটি তার জৌলুস আর কখনোই ফিরে পায়নি। অরেলিয়ানের ধ্বংসযজ্ঞের প্রায় দুইশ বছর পর ৫২৭ সালে শহরটি নতুন করে পত্তনের দিকে নজর দেয় রোমানরা। এর একশো বছর পর, ৬৩৫ সালে সিরিয়ায় অভিযান চালানোর সময় পালমিরাকে রাশেদুন খেলাফতের অন্তর্ভূক্ত করেন মুসলিম সেনাপতি খালেদ বিন ওয়ালিদ।

01palmyra.adapt.768.1
ধ্বংসস্তুপ হয়ে আজো টিকে আছে পালমিরা সম্রাজ্যের স্মৃতি
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s