জুনো পৌছে গেলো বৃহস্পতির বলয়ে

বৃহস্পতি হচ্ছে আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। ঘন মেঘের আবরণে নিজেকে ঢেকে অস্বাভাবিক গতিতে ঘুরতে থাকা এই গ্রহটি সম্পর্কে তাই বিজ্ঞানীদের কৌতূহল ছিলো সবসময়ই। কিন্তু সেই আবরণটি সরিয়ে গ্রহরাজ কে ‘কাছ থেকে দেখার’ বা জানার সৌভাগ্য এতদিন পর্যন্ত হয়নি কারো।

তবে এবার বোধহয় সুযোগটা এসেছে। পাঁচ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে চলতি মাসের চার তারিখে বৃহস্পতির বলয়ে প্রবেশ করেছে নাসার প্রোব ‘জুনো’। আগামী দুই বছর বৃহস্পতির বলয়ে অবস্থান করে এর সম্পর্কে ছবি ও ডাটা পাঠাবে স্ব নিয়ন্ত্রিত এই নভোযানটি।

যাত্রা শুরু ফ্লোরিডা থেকেChasing Juno by Melissa Christine Kendall

২০১১ সালের ৫ অগাস্ট ফ্লোরিডার কেপ কার্নিভাল থেকে যাত্রা শুরু করে জুনো। পাঁচ বছর পর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ৪ জুলাই বৃহস্পতির বলয়ে প্রবেশ করার খবর অনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় নাসার পক্ষ থেকে। এই মিশনটি চলবে মোটমাট বিশ মাস, অর্থাৎ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বৃহস্পতির বুকে ঝাপ দেয়ার মাধ্যমে সমাপ্তি হবে এই মিশনটির।

পাশের ছবিতে দেখা যাচ্ছে জুনোর উৎক্ষেপণের মুহুর্তটি দেখা যাচ্ছে… 

চারশো বছরের কৌতূহল

juno galileo script
বৃহস্পতি আবিষ্কার নিয়ে গ্যালিলিওর নোট

১৬১০ সালে টেলিস্কোপ হাতে গ্যালিলিও একটি অচেনা ‘নক্ষত্র’ কে দেখতে পান, যার চারপাশে আরও চারটি ‘গ্রহ’ ঘুরপাক খাচ্ছে। পরবর্তীতে অবশ্য তিনি বুঝতে পারেন এটি কোনো নক্ষত্র নয়, সৌরজগতেরই একটি গ্রহ। এই আবিষ্কারের আরেকটি তাৎপর্য হচ্ছে, উপগ্রহ গুলোকে গ্রহের চারপাশে ঘুরতে দেখার ফলে, মহাবিশ্বের সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে – এই প্রচলিত ধারণাটির ব্যাপারে প্রথমবারের মতো সন্দেহ সৃষ্টি হয় গ্যালিলিওর মনে। আর জানেনই তো, সকল মহৎ আবিষ্কারের শুরুটা ওই সন্দেহ থেকেই হয়!

হাজার বছরের মিথ

juno legos
বাম থেকে, গ্যালিলিও, জুনো ও বৃহস্পতি। এই তিনটি লেগো পিস পাঠানো হয়েছে জুনোর সাথে

এই নভোযানটার নাম জুনো কেন রাখা হলো তার পেছনেও আছে এক অভিনব কাহিনী। গ্রীক মিথলজিতে বৃহস্পতি বা জুপিটার হলো এক রহস্যময় দেবতা। মেঘ তৈরি করে তার প্রেমিকাদের লুকিয়ে রাখে। আর দেবী জুনো ছিলেন জুপিটারের স্ত্রী। স্বামীর পরনারী আসক্তির কথা তার কানে পৌঁছালে তিনি জাদুর মেঘ সরিয়ে সবার কাছে প্রকাশ করে দেন জুপিটারের আসল চরিত্র। (মজার ব্যাপার হচ্ছে, লো, ইউরোপা, মেটিস… জুপিটারের এই উপগ্রহগুলোর নাম রাখা হয়েছে দেবতা জুপিটারের প্রেমিকাদের নামের সাথে মিলিয়ে।)

জুনোর মিশন

আগেই বলেছি বৃহস্পতি সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই জানি না আমরা। জুনো মিশনের পুরোটা সময় গ্রহরাজের চারপাশে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ আর ছবি তোলার কাজে ব্যস্ত থাকবে। আর সেইসব তথ্য আর ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা শুরু করবেন এর রহস্য উদঘাটনের কাজ।

juno orbiting jupiter 2বৃহস্পতি সম্পর্কে অজানা বিষয়গুলোর মধ্যে আছে গ্রহটির উপরিভাগ। মেঘে ঢাকা থাকার কারণে আমরা এখনো জানি না গ্যাসীয় এই গ্রহটির উপরিভাগে কি আছে বা কিভাবে আছে। এছাড়া হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামে তৈরি গ্রহটির উৎপত্তি সম্পর্কেও আছে বেশ কিছু থিওরি যার সত্যতা ঝুলে আছে জুনোর পাঠানো তথ্যের উপর। এছাড়া বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলের অবস্থা, পানির অস্তিত্ব আর প্রকাণ্ড বেগে পাক খেতে থাকা গ্রহটির ম্যাগনেটিক ফিল্ড তার বায়ুমণ্ডলে কতটা প্রভাব ফেলে এসমস্ত অজানা রহস্যের সমাধান হবে জুনোর এই অভিযানটা যদি সফলভাবে শেষ হয়।

আছে অনেক প্রতিবন্ধকতা, আছে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি…

আমরা যতটা সহজে বাসায় বসে নাসার এইসব মিশনের খবর যেভাবে পত্রিকায় পড়ি, এইসব প্রজেক্টগুলো আসলে ততটা নিশ্চিতভাবে হয়ে যায় না। যেহেতু বৃহস্পতির বলয় সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই সীমিত, এর তীব্র তেজস্ক্রিয়তার ভেতর যেকোনো সময়েই জুনোর কলকব্জা বিকল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। তাই গ্রহরাজের খবরাখবর পেতে আগামী দুইটি বছর রুদ্ধশ্বাসেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে জ্ঞানপিপাসু দেরকে।


জুনোর পাঠানো সমস্ত ডাটা এবং ছবি পাওয়া যাবে নাসার ওয়েবসাইটে। আগ্রহী যে কেউ চাইলে সেই ডাটা নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন। পোস্টের শেষে প্রয়োজনীয় লিংক গুলো জুড়ে দিলাম wlEmoticon-smile.png

নাসার ওয়েবসাইটে জুনোর অফিশিয়াল পেইজ

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s