সূর্যের মৃত্যু : শেষের সেদিন আসবে যেদিন

আমাদের পৃথিবীতে চারপাশে তাকালে যেভাবে জীবন আর মৃত্যুর চক্র দেখতে পাই, মহাকাশও কিন্তু ঠিক তেমনই। এখানে নক্ষত্রের জন্ম হয়, মৃত্যু হয়। কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়তে থাকে তাদেরকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া গ্রহ উপগ্রহ গুলো। আর দশটি নক্ষত্রের মতো কোনো একদিন সূর্যেরও আলো নিভে যাবে, এক লহমায় অন্ধকার হয়ে যাবে চারপাশের এই বিশাল সৌরজগত। সে অনেএএএক কোটি বছর পরের কথা হোক, তবু আমাদের নিয়তি তো এটাই!

নক্ষত্রের জীবন

মহাকাশের ধূলি ও মেঘের আঁতুড়ঘরে জন্ম হয় একটি নক্ষত্রের। প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে আমাদের সূর্যের জন্মটা হয়েছিলো ঠিক এভাবে। আকার অনুযায়ী সূর্য হলো ‘মাঝারি তারা’। সে অনুযায়ী তার ‘বেঁচে থাকার কথা’ এখন থেকে আরও প্রায় ৭ বিলিয়ন বছর। তারপর একটা সময় তার কেন্দ্রের সমস্ত জ্বালানী ফুরিয়ে যাবে। আর তখন এর খোলসে থাকা অবশিষ্ট হিলিয়াম জ্বলতে শুরু করবে। ফলে সূর্য ফুঁসে উঠতে শুরু করবে ভয়াবহভাবে। ( নক্ষত্রের এই ফুঁসে ওঠা অবস্থার একটা গালভরা নামও দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা, লাল দানব।)

starcycle
একটি নক্ষত্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়

এখন থেকে সাত বিলিয়ন বছর পর যখন সূর্যের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি ঘটবে, তখন তার আকার বেড়ে দাঁড়াবে এখনকার থেকে একশত গুন বা এক হাজার গুন পর্যন্ত! এরপর খোলসের বাকী জ্বালানীটুকু শেষ হয়ে গেলে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে আলো। সংকুচিত হতে হতে একদিন নক্ষত্রটি পাকাপাকি ভাবে নিভে যাবে আকাশ থেকে। ঠিক এভাবেই একদিন মৃত্যু ঘটবে সূর্যের, আর নিকষ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে গোটা সৌরজগত।

গোল্ডিলক জোন

প্রতিটি নক্ষত্র থেকে নির্দিষ্ট একটি দূরত্বে পানির অস্তিত্ব ও জীবন ধারণের উপযোগী পরিবেশ থাকে। বিজ্ঞানীরা এই এলাকার নাম দিয়েছেন ‘গোল্ডিলক জোন’। নক্ষত্রের আকার বিবেচনা করে এই জোন নির্দিষ্ট করা হয়। নতুন কোনো একটা নক্ষত্রের খোঁজ পেলেই বিজ্ঞানীরা তার গোল্ডিলক জোন হিসেব করে সেই এলাকার ভেতর কোনো গ্রহ আছে কিনা তা খুঁজতে শুরু করেন। সৌরজগতে আমাদের পৃথিবী যে এই এলাকার ভেতরে অবস্থিত, সেকথা বলাই বাহুল্য!

habitable_Zone-1
আমাদের সৌরজগতের ‘গোল্ডিলক জোন’ : পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহকে দেখা যাচ্ছে এই এলাকার ভেতরে 

তবে সমস্যা হচ্ছে, নক্ষত্র বার্ধক্যের পর্যায়ে আসার সাথে সাথে এই গোল্ডিলক জোনের পরিবর্তন হয়। প্রায় দশ বিলিয়ন বছর পর একটি নক্ষত্র ফুঁসে ‘লাল দানবে’ পরিণত হলে গোল্ডিলক জোনও সেই অনুযায়ী অনেকখানি পিছিয়ে যাওয়ার কথা।

নীল গ্রহ মিলিয়ে যাবে সূর্যের গহবরে

আগেই বলেছি, এখন থেকে প্রায় ৭ বিলিয়ন বছর পর সূর্য ‘লাল দানবে’ পরিণত হবে। তখন তার আকার এতোটাই বিশাল হবে যে তার পরিধি গ্রাস করবে শুক্র গ্রহকে। আর সূর্যের খুব নিকটে চলে আসা পৃথিবীর গোটা আকাশ জুড়ে দেখা দেবে লাল সূর্যটা, তার প্রচন্ড তাপে সমস্ত প্রাণ আর সবুজ হারিয়ে পৃথিবী পরিণত হবে খটখটে আর নিষ্প্রাণ একটা গ্রহে। (তবে সাম্প্রতিক হিসাব বলছে পৃথিবীর পরিণতিও বুধ আর শুক্রের মতো হবে। অর্থাৎ টগবগ করতে থাকা ওই লাল সূর্যের ভেতরেই শেষমেশ নিক্ষিপ্ত হবে আমাদের এই নীল গ্রহটা।)

এই সময়টাতে অর্থাৎ সূর্যের ফুঁসে থাকা অবস্থায় ‘গোল্ডিলক জোন’ পিছিয়ে যাবে বৃহস্পতি ও শনির দিকে। ফলে তীব্র শীতে জমে থাকা এসব গ্রহগুলো উষ্ণ হতে শুরু করবে। এই গ্রহদুটোই যেহেতু গ্যাসীয়, তাই সেগুলোতে প্রাণের বিস্তার ঘটানো হয়তো সম্ভব হবে না। তবে এর পাথুরে উপগ্রহগুলো ক্রমশ উত্ত্বপ্ত হলে তাতে সৃষ্টি হতে পারে প্রাণের স্ফুরণ ঘটার উপযোগী পরিবেশ।

habitable_Zone-2
সূর্য ফুঁসে ওঠার পর সৌরজগতের সম্ভাব্য অবস্থা : ‘গোল্ডিলক জোন’ পিছিয়ে গেছে বৃহস্পতি ও শনির দিকে

বিশেষ করে বৃহস্পতির ইউরোপা আর শনির এনসেলাডাস ও টাইটানকে নিয়ে বিশেষভাবে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। কে জানে সেসময়ের মানুষ হয়তো তখন সেখানেই পাড়ি জমাবে কোটি কোটি বছরের বসত গ্রহকে পেছনে ফেলে। শ্বেত বামন হয়ে মিইয়ে যাওয়ার আগে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন বছর বাসযোগ্য থাকবে এই উপগ্রহগুলো।

অন্ধকারে শেষ

লাল দানব থেকে প্রথমে শ্বেত বামন এরপর কৃষ্ণ বামনে পরিণত হওয়ার সময়ের ভেতরেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে সূর্যের সংসার। তবে মৃত্যুর ভেতর থেকেই কিন্তু উন্মেষ ঘটে নতুন প্রাণের। তেমনি মৃত নক্ষত্রের মেঘের ভেতরেই এক সময় জন্ম নেবে এক বা একাধিক শিশু নক্ষত্র।

তবে একটি অন্যরকম পরিণতির কথাও বলা যায় এখানে। আমরা জানি এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি আমাদের গ্যালাক্সির দিকে ধেয়ে আসছে। যদি সূর্যের স্বাভাবিক জীবদ্দশায় এই দুই গ্যালাক্সির সংঘর্ষ ঘটে, তাহলে এর অনেক আগেই লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে গোটা সৌরজগত।

 


পৃথিবীর মানুষ কি পারবে এতোসব বিপর্যয় কাটিয়ে সেই সময়টাতে টিকে থাকতে, নাকি এইসব নতুন নক্ষত্রে নতুন করে হবে প্রাণের সঞ্চার? এই প্রশ্নটা তখনকার ‘মানুষ’দের জন্যই তোলা থাকুক, এটা একান্তই তাদের সংকট – তাদের পরিণতি এখন আমরা শুধুই অনুমান করতে পারি, আর করতে পারি আশা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s