সিরিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপট : আল নুসরা ফ্রন্ট

প্রচণ্ড গরমের এক দুপুর। ইরাক আর সিরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি একটি জায়গায়  দাড়িয়ে আছে দুইটি পিকআপ ভ্যান। সাদা চোখে সাধারণ বেসামরিক গাড়ী মনে হলেও স্থানীয়রা জানে এগুলো কাদের এবং কি উদ্দেশ্যে এখানে চলাচল করে। সিরিয়ার বাজার থেকে অস্ত্র কিনে এই রুট দিয়ে সেগুলো ইরাকে নিয়ে যায় আল কায়দা। আর এই ভ্যানগুলো বিভিন্ন পয়েন্টে থাকে অস্ত্র বোঝাই সেসব ট্রাককে এসকর্ট করার জন্য।

কিন্তু আজকের ব্যাপারটি ভিন্ন। এটা স্থানীয়দের জানার কথা না। আজ তারা অস্ত্রের চালান পার করতে আসেনি। ইরাক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতাকে পাঠানো হয়েছে সিরিয়াতে। তারা এসেছে উনাকে রিসিভ করে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে। ঘন্টাখানেক পর একটি গাড়ী বহর এসে দাঁড়ালো সেখানে। গাড়ী থেকে যিনি নামলেন তার নাম আবু মুহাম্মদ আল জাওলানী।

Al Nusra

মার্কিন বাহিনীর বোমা হামলায় নিহত আল কায়দা প্রধান জারকাবির বিশ্বস্ত সহচর জাওলানী মসুল থেকে সিরিয়াতে এসেছেন বর্তমান প্রধান বাগদাদীর নির্দেশে। এখানে ‘জিহাদ’এর ভিত্তি মজবুত করতে হবে।

এটা ২০১১ সালের অগাস্ট মাসের কথা। আবু বকর আল বাগদাদী তখন ইরাকের আল কায়দা প্রধান। মার্কিন আগ্রাসনের পর প্রায় ভেঙ্গে পড়া আল কায়দা নেটওয়ার্ককে তিনি নতুন করে গড়ে তুলছেন। এদিকে সিরিয়াতে তখন বাশার বিরোধী যুদ্ধ চরমে পৌঁছেছে। আর যুদ্ধের প্রয়োজনে সেখানে গড়ে উঠেছে অস্ত্রের বিশাল বাজার। মূলত অস্ত্র পাচারের রুটগুলো সুরক্ষিত করতে জাওলানীকে সিরিয়া পাঠিয়েছিলেন বাগদাদী। আর তার জন্য যা প্রয়োজন, সমস্ত রকম সহায়তা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো স্থানীয় প্রধানদের।

পৌঁছানোর ঠিক পাঁচ মাসের মাথায়, জাওলানীর নেতৃত্বে ‘জাবহাত-আল-নুসরা’ নামে একটি নতুন জঙ্গীদলের আত্মপ্রকাশ ঘটে সিরিয়াতে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন জঙ্গিদের একটি দল ইরাক থেকে সিরিয়াতে সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা করছে। সেবছর মে মাসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জাওলানীকে চিহ্নিত করে ‘সর্বোচ্চ বিপদজনক’ ব্যক্তি হিসেবে।

জাবহাত-আল-নুসরা বা পরবর্তীতে ‘আল-নুসরা ফ্রন্ট’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া সশস্ত্র এই জঙ্গি সংগঠনটি এখন বাশার এবং আইসিস বিরোধী সামরিক জোটের সবচেয়ে বড় শরীক।

আল কায়দা হয়ে গেলো ‘আইসিস’

নুসরা-ফ্রন্ট গঠনের পর থেকেই বাগদাদীর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ হতে শুরু করে জাওলানীর। ‘ট্রেডিশনাল’ আল কায়দার ধ্যান ধারণার বাইরে এসে বাগদাদী যে মাঝে মাঝেই ‘ইউটার্ণ’ নিচ্ছিলেন তা পোড় খাওয়া এই জঙ্গীনেতার দৃষ্টি এড়ায় নি। তাদের এই মতভেদ প্রকাশ্য হয় ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে।

Al-Qaeda-chief-Ayeman-Jawahiri20140906201142দ্বন্দটা এতোই তীব্র হয়েছিলো যে শেষ পর্যন্ত এর মধ্যে ঢুকে পড়েন জাওয়াহিরী। ‘লাদেনের ডান হাত’ খ্যাত প্রবীণ এই জঙ্গি নেতা এক খোলা চিঠিতে দুজনকে আহবান করেন তারা যেন ‘জিহাদের স্বার্থে’ এসব ছোটখাটো ঝামেলা চুকিয়ে ফেলেন।

এরপর পর্দার আড়ালে কি হয়েছে তা আমাদের অজানা।

phone_baghdadi_imgকিন্তু ঠিক সেই মাসের শেষ দিকে বাগদাদী ঘোষণা দেন ইরাক আল কায়দা বিলুপ্ত করে তিনি নতুন একটি সামরিক জোট গঠন করেছেন। এবং এখন থেকে ইরাকের ‘জিহাদ’ পরিচালিত হবে সুন্নী গেরিলাদের নতুন জোট – ‘আইএসআই’ এর ব্যানারে। পরবর্তীতে সিরিয়াতে এসে তিনি জাবহাত-আল-নুসরা কে নির্দেশ দেন এই নবগঠিত জোটে শরীক হতে।

জাওয়াহিরী না বাগদাদী?

আসলে বাগদাদী প্রথম থেকে বুঝে শুনেই সমস্ত চাল দিয়েছেন, ফলে আল-কায়দা ভেঙ্গে দিয়ে আইসিস গঠনের পর তাকে দৃশ্যত কোনো চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়নি। অন্যদিকে এই ঘোষণা আসার সাথে সাথেই ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ‘জাবহাত-আল-নুসরা’। এদের একটা অংশ নবগঠিত আইসিস এর আনুগত্য স্বীকার করে নেয়, ফলে ISI সম্প্রসারিত হয়ে দাঁড়ায় ISIS বা আইসিস-এ। অন্যদিকে জাওলানীর নেতৃত্বে ‘আল-নুসরা ফ্রন্ট’ নামে অন্য অংশটি থেকে যায় আল কায়দা নেটওয়ার্কের শাখা সংগঠন হিসেবে।

ত্রিমুখী যুদ্ধের সমীকরণ

সিরিয়াতে আল-নুসরার মূল শত্রু স্বৈরাচারী বাশার আল আসাদের সরকার। সেই হিসেবে ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মি’ বলে পরিচিত সামরিক জোট তাদের মিত্র। সরাসরি তাদের জোটে না থাকলেও যুদ্ধের মাঠে তাদের বোঝাপড়া বেশ ভালোই। ( সেকারণে বছর খানেক আগে আল-নুসরাকে জঙ্গি সংগঠন ঘোষণা করার পর রীতিমতো ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো ‘সেকুলার’ ফ্রি-সিরিয়ান-আর্মি)

অন্য দিকে থাকলো আইসিস। বাশারের সরকার উৎখাতের ‘জিহাদ’ করলেও একই সাথে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির বিরুদ্ধেও তারা যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমান তালে। আর আল-নুসরার সাথে জন্মের সময় থেকে বৈরিতা তো আছেই।

বামে আইসিসের পতাকা, আর ডানে নুসরা ফ্রন্টের
বামে আইসিসের পতাকা, আর ডানে নুসরা ফ্রন্টের

যুদ্ধক্ষেত্রে চরম শত্রুতা থাকলেও আদর্শিক ভাবে আইসিস এবং নুসরার গোড়া কিন্তু আবার এক। ‘নাপাক’ পশ্চিমা গণতন্ত্র দুদলেরই চোখের বিষ। শুধু পার্থক্য এই যে, একপক্ষ সেটা প্রকাশ্যে স্বীকার করছে, আর অন্য পক্ষ চেপে আছে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠানিকভাবে আল কায়দা নেটওয়ার্ক থেকে আইএসকে বাদ দেয়া হলেও, মধ্যপ্রাচ্যে শত্রু-মিত্রের সমীকরণ কখন কোথায় ঠেকে বলা মুশকিল।

বাইরের বিশ্বে আল নুসরার বন্ধু তালিকা বেশ দীর্ঘ, সৌদি আরব, কাতার এবং কুয়েত তাদের ফান্ডের অন্যতম যোগানদাতা। আর পর্দার আড়ালে তুরস্ক তাদের সাথে লিঁয়াজো রাখা সহ বিভিন্ন সাহায্য সহায়তা করছে সম্প্রতি। একই ভাবে, আইসিস বিরোধিতার কারণে আমেরিকাও তাদের প্রতি কিছুটা সদয়। এবং খুব স্বাভাবিক ভাবে, রাশিয়া এবং ইরান তাদের চোখে শয়তানের (আসাদের) সহচর।

সুশীল ‘জঙ্গি’?

নুসরা যোদ্ধার পকেটে আল-কায়দার পতাকা

লাদেন পরবর্তী সময়ে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ এর মুখোমুখি হয়ে আল কায়দার ‘জিহাদের স্ট্রেটেজি’তে বড় কিছু পরিবর্তন আসে। তার মধ্যে অন্যতম ছিলো জঙ্গিবাদের রিব্র্যান্ডিং। মেইনস্ট্রিমের মিডিয়ার জঙ্গিবাদ বিরোধী প্রচারণা সামাল দিতে না পেরে তারা ‘আল কায়দা’র ব্যানার ঝেড়ে ফেলে দেশে দেশে বিভিন্ন নামে সংগঠন চালাতে শুরু করে। আর অবস্থাভেদে মতাদর্শেও আনা হয় নানা রকম পরিবর্তন।

এই ব্যাপারটি আল-নুসরার ক্ষেত্রেও ঘটে। জঙ্গি হামলা আর যুদ্ধের পাশাপাশি তারা আলাদা ইউনিটে তারা শুরু করে স্থানীয়দের মাঝে খাবার বিতরণ, চিকিৎসা সেবা দেয়া সহ নানারকম ‘ভালোমানুষি’ কার্যক্রম।

আলেপ্পোর রাস্তায় নুসরা ফ্রন্টের ক্যাম্পেইন
আলেপ্পোর রাস্তায় নুসরা ফ্রন্টের ক্যাম্পেইন

বড় শহরগুলোতে যুদ্ধ লাগলে দিশাহারা আসাদ সরকার গোটা বাহিনী নিয়ে যখন জঙ্গি দমনে নেমে পড়ে, তখন এই ইউনিটগুলো ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। ফলে ক্রমশ লম্বা হতে থাকে রিক্রুটমেন্টের লিস্ট, আর গায়ে লাগতে শুরু করে ‘মডারেট মুসলিম গ্রুপ’ এর তকমা।

একটা পর্যায়ে আল জাজিরাকে দেয়া টিভি সাক্ষাৎকারে জাওলানী কবুল করেন, আমেরিকা বা পশ্চিমা বিশ্বে হামলা করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। এবং তাদের দুইটা মাত্র শত্রু – বাশার এবং আইসিস।

8285f89889ed44aa8d3516d2dd9a6de0_18
“আমাদের শত্রু শুধু বাশার আর আইসিস” – আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জাওলানী

মুখে এসব বুলি ঝাড়ার পাশাপাশি জাওয়াহিরির আনুগত্য ত্যাগ করতেও অস্বীকৃতি জানান জাওলানী। এই কারণে তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে আমেরিকার গুড বুকে জায়গা করে নেয়া সম্ভব হয়নি তাদের। (সম্প্রতি অবশ্য এক অডিও বার্তায় আল-নুসরাকে স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে চলার অনুমতি দিয়েছেন জাওয়াহিরী।)

তবে পত্রিকায় মাঝে মাঝেই দেখবেন, আমেরিকা ‘আসাদ বিরোধী’ গ্রুপগুলোকে আকাশ থেকে টাকা আর অস্ত্র সাহায্য দিয়েছে – কয়েক হাত ঘুরে হলেও সেসব আসলে যায় এই নুসরা দের হাতে।

শেষকথা: আইসিসের চেয়েও বড় হুমকি?

আইসিসের সাথে আল-নুসরার তুলনা করতে একটা পয়েন্টই যথেষ্ট।

নুসরা ফ্রন্টের যোদ্ধারা বেশিরভাগ সিরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা
নুসরা ফ্রন্টের যোদ্ধারা সিরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা

ইরাকের সুন্নী জিহাদি গ্রুপ গুলোর অংশগ্রহণ সত্ত্বেও আইসিসের আর্মির একটা বড় অংশই বিদেশী। এশিয়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ‘জিহাদি জোস’ নিয়ে আসা তরুণরা মূলত আইসিসকে এতো শক্তিশালী করেছে, আবার গোটা বিশ্বে তাদেরকে পরিচিতও করেছে।

অন্যদিকে আল-নুসরার যোদ্ধাদের প্রায় সকলেই সিরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা। তারা শুধু যে দেশটাকে খুব ভালোভাবে চেনে তাই না, বরং দেশটা আদতে তাদের।

আইসিস একটা সময় দুর্বল হয়ে পড়বে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তবে তাতে কিন্তু যুদ্ধ থামবে না। বরং বছরের পর বছর নির্দয়ভাবে শাসিত হওয়া জনগোষ্ঠীর ভেতর, আল কায়দার ‘খেলাফতি’ স্বপ্নের যে বিক্রিয়া হচ্ছে আল-নুসরার ব্যানারে – তার পরিণতি কতটা বিভীষিকাময় হয়, তা আমাদের এখনো দেখা বাকী।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s