প্রসংগ: অন্তর্জালে বাংলা টাইপ, বিজয় ও রিদমিক বিতর্ক

এন্ড্রোয়েড ফোনে বাংলা লেখার জন্য সর্বাধিক ব্যাবহৃত অ্যাপ ‘রিদমিক কিবোর্ড’ প্লে স্টোর থেকে অপসারন করেছে গুগল। অভিযোগ হলো, তারা কপিরাইট লংঘন করেছে। পিসিতে বা মোবাইলে বাংলা লেখার জন্য আমরা সাধারনত যে দুইটা লেআউট ব্যবহার করি তার একটা হলো ফোনেটিক, আরেকটা বিজয়। পিসিতে লেখালিখি, অফিস-আদালত বা প্রকাশনার কাজে বাংলা ব্যবহারের সূত্রপাত হয়েছিলো বিজয়ের হাত ধরে, আর আজ অন্তর্জালে বাংলা ভাষার যে জয়জয়কার আমরা দেখি তা ঘটেছে অভ্রের মাধ্যমে।

দুই সফটওয়ারেরই পর্যাপ্ত ইউজার বেজ আছে, এর কারণটা আসলে অভ্যাসের, মানে বিজয়ে টাইপ করে অভ্যস্ত কেউ চাইলেই অভ্রতে স্বচ্ছন্দে লিখতে পারবে না, আর অভ্র থেকে হুট করে বিজয়ে কাজ করা তো বলতে গেলে অসম্ভব। (এই বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা একটু পরে বলছি)

বিভেদটা শুরু হয়েছিলো অভ্রের ‘ইউনিজয়’ নামের একটি লেআউটের মাধ্যমে। যারা বিজয়ে টাইপ করে অভ্যস্ত, তাদের জন্য বিজয়ের লেআউট ব্যাবহার করে অভ্রতে টাইপ করার একটা সুযোগ রাখা হয়েছিলো। কিন্তু বিজয় তা মানবে কেন? তাদের লেআউট দিয়ে যদি অন্য সফটওয়ারে লেখা যায়, তাহলে তাদের সফটওয়ার কিনবে কেন মানুষ? কপিরাইট লংঘনের অভিযোগে অভ্রের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন বিজয়ের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা জব্বার।

পরবর্তীতে ভার্সন আপগ্রেড করে ‘ইউনিজয়’ লেআউট বাদ দিতে বাধ্য হয় অভ্র। (আসলে ব্যপারটা হয়েছে আইওয়াশের মতো, আর সব অপশনের সাথে লেআউট এডিটর নামের একটা অপশন যুক্ত করে দিয়েছে তারা, সেটার মাধ্যমে যে কেউ বিজয় বা নিজেদের ইচ্ছামতো লেআউট তৈরি করে তা দিয়ে লিখতে পারবে ব্যবহারকারীরা।)

ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে রিদমিকের ক্ষেত্রেও। তাদের বাংলা লেখার অ্যাপে ফোনেটিকের সাথে ইউনিজয় লেআউটে লেখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিলো। এদিকে গত মাসে অ্যান্ড্রোয়েড ফোনে বাংলা লেখার জন্য অফিশিয়াল অ্যাপ প্লে স্টোরে আপলোড করেছে বিজয়। সম্ভবত তাদের অভিযোগের ভিত্তিতেই রিদমিক অ্যাপটি সরিয়ে দিয়েছে গুগল।

এখানে একটা ব্যপার হলো, বিজয়ের এই লেআউট সম্পূর্নভাবেই তাদের নিজেদের সম্পদ, অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ সেটা ব্যবহার করলে আইনের চোখে তা অপরাধ। বিজয় যদি নিজেদের অ্যাপে ফোনেটিক লেআউটে টাইপ করার সুযোগ রাখতো, সেক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতো। (যদিও যতদূর জানি অভ্র তাদের লেআউট শেয়ার করার ব্যপারে যথেষ্টই উদার, তাদের স্লোগানই হচ্ছে, ভাষা হোক উন্মুক্ত)।

রিদমিকের পাশাপাশি মায়াবী নামেও একটি কিবোর্ড অ্যাপ আছে প্লে স্টোরে। সংখ্যার দিক দিয়ে সেটির ব্যবহারকারীও কম না। তবে তারা এই ‘ইউনিজয়’ লেআউট ব্যবহারের সুযোগ রাখে নি নিজেদের অ্যাপে। তাই বহাল তবিয়তেই আছে তারা। সুতরাং, লিস্ট থেকে ইউনিজয় কে ছেঁটে ফেলে রিদমিকও খুব শীঘ্রই হয়তো চলে আসবে স্টোরে।

এখানে যে ব্যপারটা খুবই দৃষ্টিকটু লাগছে তা হলো, সমস্যার কারণ না জেনে বা বুঝে অযথাই গালিগালাজ আর ট্রলের যে বন্যা বয়ে যাচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে। কিন্তু কেন? বিজয় যদি নিজেদের লেআউট নিয়ে ব্যবসা করতে চায়, করুক না! আইন তো তাদেরকে সেই অধিকার দিয়েছে!

আর আমার মনে হয় না ফোনে লেআউট পরিবর্তন করার কোনো প্রয়োজন আদৌ হয়। মানে, ফোনেটিকে লিখতে লিখতে হঠাৎ কিসের দুঃখে কেউ বিজয়ে লিখতে শুরু করবে? এখনকার সময়ে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বেশিরভাগই তরুন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা অংশ ফোনেটিক ব্যবহার করে। তাই রিদমিকের জন্য এখানে হারানোর কিছু নাই। অন্যদিকে, যারা ইউনিজয় ব্যবহার করতেন, তারা নিশ্চিতভাবেই পিসিতে বিজয় ব্যবহার করেন, তাই অফিশিয়াল অ্যাপ ব্যবহার করতে তাদেরও কোনো আপত্তি থাকার কথা না নিশ্চই!

এবার আসি নিজের অভিজ্ঞতার বিষয়ে।

আমাদের বাসায় যখন প্রথম কম্পিউটার কেনা হয়েছিলো ২০০০ সালে। অফিস আদালতে কম্পিউটার যেতে শুরু করেছে মাত্র। দাপ্তরিক কাজগুলো কম্পিউটারে সারার জন্য নিয়ম করে টাইপিং শিখেছিলেন আমার বাবা। তখন থেকে এখনো টাইপ করা বলতে বিজয়কেই বোঝেন উনি। অভ্র দিয়ে যখন বিজয় লেআউট ব্যবহার করা যেতো, তখন একাধিক বার সেটায় অভ্যস্ত করার চেষ্টা করেছি আব্বুকে, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। এখনো ফেসবুকে বাংলা লেখার জন্য উনার ভরসা বিজয়। (এবং আমি মোটামুটি ১০০% শিওর নোকিয়ার বাজেট ফোনটা ফেলে দিয়ে হঠাৎ করেই আব্বু যদি এন্ড্রোয়েড ফোন ব্যবহার শুরু করেন, উনার ডাউনলোড প্রথম অ্যাপ হবে ‘বিজয় কিবোর্ড’, তা যতই স্লো আর ব্যবহারের আযোগ্য হোক)

আর আমি বাংলায় লেখালিখি শুরু করেছি অভ্রের হাত ধরে। জটিল চার্ট মুখস্ত করা বা আলাদা করে টাইপিং শেখার ধৈর্য কোনোকালেই হয়নি আমার। তাই ফোনেটিক কিবোর্ড আসার আগ পর্যন্ত আমার বাংলা টাইপিং এর গতি ছিলো ঘন্টায় দুইলাইন। নিজে অভ্র দিয়ে লিখি। আর নতুন নতুন পিসি কেনার পর কাউকে বিজয় দিয়ে বাংলা লেখার চেষ্টা (বা সংগ্রাম) করতে দেখলে অভ্র ব্যবহারের পরামর্শ দেই। (এই অপরাধে মোস্তফা জব্বার সাহেব চাইলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন, লাভ নাই!) 😉

আমার বাসায় অভ্র-বিজয়ের এই যে বিভেদ, সেটা সারা দেশের জন্যেই সত্য। একেক জন একেকটায় লিখে অভ্যস্ত, একেক অফিসের কাজ একেকটা দিয়ে করা হয়, এবং এটা এভাবেই চলবে আরও কিছুদিন। তাতে তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সবাই মিলে যা লিখছি, তার আউটপুট তো একই, একগাদা ঝকঝকে বাংলা হরফ। মোবাইলেও এর বিস্তার ঘটুক, জাতিগত ভাবে সেটাই তো আমাদের একমাত্র কাম্য হওয়া উচিত, নয় কি!

Phtoto Credit: Ruhul Kabir

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s