যে কারণে এরশাদ এই দেশের রাজনীতিতে এতোটা গুরুত্বপূর্ণ

সকাল হয়েছে। শীতের মিষ্টি রোদ তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকার রাস্তায়। দিনটা ১৯৯০ সালের ১২ জানুয়ারি। মাত্র কয়েকদিন আগে তুমুল অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটেছে। মগবাজারের একটি বাসার সামনে দাড়িয়ে আছে পুলিশের ট্রাক। তাদের কাছে খবর আছে কাছেই কোনো একটা বাসায় আত্বগোপন করে আছেন জাতীয় পার্টির তখনকার মহাসচিব শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।

ফ্লাটের ভেতর ঢুকেই নিশ্চিত হওয়া গেলো ব্যাপারটা, হ্যা তিনি এখানেই আছেন। সিদ্ধান্ত হলো ঝামেলা না করে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ভালোয় ভালোয় নিয়ে যাওয়া হবে। তাই করা হলো, উনি নিজে থেকেই নেমে আসলেন। কিন্তু ততক্ষণে এই খবর রটে গেছে আশেপাশে। মানুষজন জড়ো হয়ে গেছে স্বৈরাচারের অন্যতম এই দোসরটিকে দেখতে। তাকে নিচে নামিয়ে আনতেই জনতার উল্লাস বাঁধ ভাংলো। হৈ হৈ আর আনন্দ ধ্বনির মধ্যেই আসামীকে নিরবে পুলিশ ভ্যানে তোলার এন্তেজাম করা হলো। কিন্তু পুলিশ ভ্যানের পাদানির উপরে হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে গেলেন শাহ মোয়াজ্জেম।

আটকের খবরে উল্লাসরত বৈরি জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বললেন,

গ্রেপ্তার বহুবার হয়েছি। এটা নতুন কিছু নয়। আবার ফিরে আসবো। সেদিন আপনারাই জিন্দাবাদ দেবেন।

এই ঘটনাটা শাহ মোয়াজ্জেম তার আত্বজীবণীতেই উল্লেখ করেছেন। যতবার বইটার পাতা উল্টাই ঠিক এই জায়গাতে এসে হোচট খাই। কেন যেন মনে হয় তার দুই লাইনের এই স্টেটমেন্টের ভেতরেই এরশাদের সারা জীবনের পলিটিক্যাল স্ট্রেটেজি লুকিয়ে আছে। আসলেই তো! চিন্তা করলে সবকিছুই মিলে যায়। এরশাদকে তো আমরাই পতন ঘটিয়েছি। তারপর তাকে জেলে পাঠিয়েছি। এরপর, ঠিক শাহ মোয়াজ্জেমের কথামতো, তারা ফিরে এসেছে, তখন আমরাই তাকে জিন্দাবাদ দিচ্ছি। আপনি আমি হয়তো দিচ্ছি না, কিন্তু আমাদেরই একটা অংশ দিচ্ছে।

এবার একটু অন্যদিকে যাই, রাজাকার ইস্যুতে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা জামাত শিবির কে রাজনৈতিক আর সামরিক ভাবে পরাজিত করলাম। এর এক যুগের মাথায় তাদেরকে দেশে নিয়ে আসা হলো, তাদেরকে কারামুক্ত করা হলো, জিন্দাবাদ দেয়া হলো। ঠিক যেমন ভাবে শাহ মোয়াজ্জেম বলেছিলেন।

এই যে আমরা সাপের বিষদাঁত তুলি, আবার তার আকুতি দেখে মায়া লাগলে আবার সেই দাঁত পুনস্থাপন করে দেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এমনকি পাকিস্তানের মতো দেশেও সামরিক শাসকের ভাগ্যে জেল আর অসংখ্য দুর্ণীতির মামলায় কোর্টে হাজিরার চেয়ে বেশি কিছু জোটে না। আর আমাদের দেশে এরকম সামরিক শাসকরাই নির্বাচনের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। কে জিতবে কে হারবে সেটা সে ঠিক করে দেয়। জার্মানীতে ইহুদী নিধন আর গণহত্যা চালানো হিটলারের নাৎসী পার্টিকে সমূলে উচ্ছেদ করা হয়েছে।সেখানে প্রকাশ্যে তাদের নাম উচ্চারন করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর আমাদের দেশের জামাত বিরোধী জোটের অন্যতম দল।

কেন এমন অস্বাভাবিক ব্যাপারগুলো আমাদের দেশে ঘটছে? এর দায় আসলে কার? এরশাদ বা জামাতের? তারা কি এই কয় বছরে জনগণের এতোই খেদমত করেছে যে জনগন সব অপকর্ম ভুলে তাদের কোলে তুলে নিয়েছে?

না তারা কিছুই করেনি, চুপচাপ থেকে তারা শুধু অপেক্ষা করেছে। দায়টা আসলে আমাদের। আমরা একবার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাড়াতে গিয়ে তুলে আনছি জামাত শিবিরকে, আবার জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে দাড়াতে গিয়ে কাছে টানছি পতিত স্বৈরাচারকে। কিন্তু তাতে তেমন একটা ফল কখনোই পাওয়া যায় নি। কিভাবে যাবে? স্বৈরাচার এখন গণতন্ত্রের ভেতর ঢুকে জোটে যাওয়া আর না যাওয়ার দর কষাকষি করছে , আর জামাত বিএনপির লেজ ধরে ঝুলে ঝুলে অপেক্ষা করছে কখন আবার তাদের ‘জিন্দাবাদ নেয়ার’ সময় আসবে।

যতদিন পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের নামে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে, দৈত্য দানব বের করে এনে ‘জিন্দাবাদ দিয়ে’ তাদের পুনর্বাসিত করার চর্চা অব্যাহত রাখবে, ততদিন পর্যন্ত এরশাদ, জামাত, বাংলা ভাই, জঙ্গী, জেএমবি এইসব ফ্যাক্টর রাজনীতিকে এভাবেই কলুষিত করে রাখবে।

অফটপিক: শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন জাতীয় পার্টির পাট চুকিয়ে এখন বিএনপির রাজনীতি করছেন। পার্টি ছাড়ার আগে একটা কথা বলেছিলেন, “জাতীয় পার্টি করতে গিয়ে জীবনে যতবার এরশাদ এরশাদ করেছি, ততবার আল্লাহ আল্লাহ করতে এতোদিনে ওলী আউলিয়া হয়ে যেতে পারতাম।”

ইদানিং লক্ষ্য করছি তিনি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন, সভা সেমিনার করা শুরু করেছেন। তো তার সেই বই থেকে নব্য জাতীয়তাবাদী এই নেতার কয়েকটা ‘জোকস’ তুলে দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।

জিয়াউর রহমানের বিধবা পত্নী বেগম খালেদা জিয়া কোনদিন রাজনীতি করেননি। প্রয়াত স্বামীর কারণে এবং উত্তরাধিকার সূত্রেই তার দলের প্রধান হয়ে বসা। জিয়াউর রহমান সাহেবের মর্মান্তিক মৃত্যুকে সকলেই অসমর্থন করেছে। মানুষের সেই সহানুভূতি সম্বল করে সে একটি সংগঠিত দলের চেয়ারপার্সন হয়ে বসলো। জিয়ার আসনটির প্রতি তার দৃষ্টি। সে আসনে অন্যকে আসীন হতে দেখলে তার নাখোশ হওয়ার সমূহ কারণ বিদ্যমান। সে কোনো নির্বাচনেরই পক্ষপাতী না। প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিই সে মানে না। স্বামীর আমলে আপত্তি করেননি কেন?

(মিটিং এর কথা বলে গাড়ীতে উঠিয়ে সোজা জেলে ভরে দেয়ার পর) ..ঘৃণায় তাদের দিকে ফিরেও তাকালাম না। এ ঘৃণা তাদের জন্য নয়। এ ঘৃণা সেই লোকটির জন্যে যে এত বড় উচ্চাসনে অবস্থান করেও এমনি নিচু স্তরের প্রবঞ্চনা এবং অহেতুক নিপীড়নের পন্থা বেছে নিতে পারে। সেদিনই ঠিক করেছিলাম আল্লাহ যেন এই লোকের সাথে আমার আর সাক্ষাৎকার না ঘটায়। জীবনে যা-ই করি না কেন, জিয়াউর রহমানের ছায়া যেন কোনদিন মাড়াতে না হয়!

ছবি কার্টেসিঃ বিডি টুডে ডট নেট।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s