আত্মপক্ষ সমর্থন: আমি নেট থেকে ডাউনলোড করে বাংলা গান শুনি

প্রথমেই বলে নেই ব্যাপারটা এরকম না যে আমার পকেটে সিডি বা ক্যাসেট কেনার টাকা নাই, অথবা পাইরেসির কারণে দেশের শিল্প আর শিল্পীরা যে ভয়াবহ রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র-ও দ্বিমত আছে। শক্ত হাতে পাইরেসি বন্ধ করা না হলে আর সব কিছু থাকলেও অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে যে লালবাতি জ্বলবে সে ব্যাপারেও আমি সচেতন। সমস্যাটা আসলে অন্যখানে..

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভিতে প্রচারিত 'আমরাই বাংলাদেশ' অনুষ্ঠানে পাইরেসি নিয়ে কথা বলছেন মাকসুদ, আইয়ুব বাচ্চু ও লিংকন
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভিতে প্রচারিত ‘আমরাই বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে পাইরেসি নিয়ে কথা বলছেন মাকসুদ, আইয়ুব বাচ্চু ও লিংকন

একেবারে ছোটবেলাতে, যখন নিজের আশেপাশে তেমনিভাবে জগতের সাথে পরিচিত হই নি, তখন গান বলতে বুঝতাম ভাঙ্গা একটা ক্যাসেট প্লেয়ার, আর এক কাটুন আধুনিক গান আর গজলের ক্যাসেট। ছুটির দিনগুলোতে প্রায়ই সারাদিন একের পর এক এসব গান বাসায় বাজতো। স্কুল ছুটির পর খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, তাই বড়দের উদ্ভট এই আচরণে খুব একটা মাথা ঘামাতাম না। পরে যখন একটু বড় হয়েছি। তখন ব্যান্ডের গানের রমরমা সময়। এলআরবি, আর্ক, ফিলিংস…এক একটা করে অ্যালবাম বের হয় আর দোকানের সামনে ক্যাসেট কেনার জন্যে রীতিমতো লাইন পড়ে যায়। প্রিন্স মাহমুদের সুরে একের পর এক বের হচ্ছে দেয়াল, হারজিত…।

মনে আছে সেসময় টাকা জমাতাম তিরিশ টাকা করে, টিফিনের সময় পাঁচ টাকা দশ টাকা করে জমিয়ে কোনোভাবে তিরিশটা টাকা হলেই জমানো শেষ! সোজা ক্যাসেটের দোকান। অনেক সময় টাকা থাকলেও কাজ হতো না। একবার এলআরবির একটা অ্যালবাম কিনতে দোকানে গিয়ে শুনি যতগুলা কপি আনা হয়েছিলো সব বিক্রি হয়ে গেছে, মন খারাপ করে বাড়ী ফিরে গেলাম।

এরপর আসলো সিডির যুগ। বড় সড় একটা কার্টনের ভেতর পুরনো আধুনিক গান/গজলের ক্যাসেট আর আমার কেনা সমস্ত ক্যাসেট ভরে প্যাক করে বাড়ীর চিলেকোঠায় তুলে দিলাম। নতুন সব অ্যালবাম কেনার পাশাপাশি পুরনো সব অ্যালবামের গানগুলো নিয়ে একটা এমপিথ্রি বানিয়ে নিলাম। নতুন এলবামের এমপিথ্রি পাওয়া যেতো, কিন্তু সেগুলার চেয়ে নতুন ঝকঝকে অ্যালবাম গুলো কিনে শুনতেই বেশি ভালো লাগতো। এক ঈদে কয়েকটা সিডির সাথে দোকানদার একটা এমপিথ্রি সিডি ফ্রি দিয়েছিলো। হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখলাম অপরিচিত কিছু ব্যান্ডের নাম।

সেই সিডিটার প্রথম দশটা গান খুব মনে ধরেছিলো, পরে সেই দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম এই অ্যালবাম টার নাম কি? সে আলাদা করে বলতে পারলো না। পরে বেশ খোঁজাখুঁজি করে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে অ্যালবাম টা কিনেছিলাম। সেই অ্যালবামের নাম ছিলো অন্যসময়, ব্যান্ডের নাম আর্টসেল।

এরপর যে ব্যাপারটা হলো, সিডি কেনার বাতিক শুরু হলো। সময়টা তথাকথিত ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ মিউজিকের। জি-সিরিজ থেকে যা কিছু বের হয় কিনে নিয়ে বাসায় আসি। একটু ভলিউম বেশি হলেই রুমের দরজায় টোকা পড়ে, এসব কি শুনিস? এতো চিল্লাফাল্লা কিসের? তবু অনবরত বেজে চলছে আমার সিডিটা, এসব কথায় কান দেয়ার সময় আমার কই!

এটা আসলে কলেজ লাইফের কথা বলছি। তারপরে ঠিক যা হলো, ভার্সিটি লাইফ শুরু হলো, সাধের সিডি কেস আর প্লেয়ারটাকে বিদায় জানিয়ে মাল সামান গুছিয়ে হলে উঠলাম। এরপরে আর অরিজিনাল অ্যালবাম কেনা হয়নি। সিডি কেস টা হারিয়ে ফেলেছি, সিডি প্লেয়ারটাও নষ্ট। নোটবুকে অথবা মোবাইলে গান শুনি, সেখানে নতুন পুরাতন বাংলা ইংরেজি যা কিছু গান আছে সেগুলো হয় বন্ধুদের কাছ থেকে ব্লুটুথে পাওয়া অথবা নেট থেকে নামানো। এই ভাবেই এখন চলছে, নতুন আর করে একটা সিডি প্লেয়ার কেনার কোনও ইচ্ছা আমার আপাতত নাই তাই সিডি কেনা অর্থহীন।

একটু আগে বললাম যে ভার্সিটিতে উঠার পর আর অরিজিনাল সিডি কেনা হয়নি, কথাটা আসলে পুরাপুরি সত্যি না। ওয়ারফেজের ‘সত্য’ অ্যালবাম টা গত বছর কিনেছিলাম, এরপর বন্ধুর ল্যাপটপে গানগুলো রিপ করে মোবাইলে নিয়ে তারপর সিডিটা আবার প্যাক করে একজনকে গিফট করেছি। এতোগুলো কথা বললাম কারণ সেদিন ‘আমরাই বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে লিংকন, মাকসুদ এবং আইয়ুব বাচ্চু এসেছিলেন। এবং সেখানে আলোচক সহ সবাই-ই একবাক্যে বলছিলেন, নেট থেকে গান ডাউনলোড করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, ডাউনলোড করে শোনা মানে শিল্পীর পেটে লাথি মারা। সবচেয়ে বড় কথা, এই কারণেই তারা নতুন গান করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন এবং ডাউনলোড করে গান শোনা বন্ধ করতে পারলেই অডিও ইন্ডাস্ট্রিকে রক্ষা করা যাবে বলে তারা সকলে মনে করছেন।

এর কিছুদিন আগে বাংলানিউজ২৪কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাচ্চু ভাই নিজের গিটারগুলো জ্বালিয়ে দেয়ার কথা পর্যন্ত বলেছেন। বলেছেন তার পক্ষে আর আশাবাদী হয়ে বসে থাকা সম্ভব না কবে অডিও ইন্ডাস্ট্রি পাইরেসি মুক্ত হবে আর তারপর শিল্পীরা প্রাপ্য সম্মান পাবেন।

যেহেতু গান ডাউনলোড করার বিচার শুরু হলে বাকী জীবনটা আমাকে নির্ঘাত জেলে কাটাতে হবে। এবং তারচেয়ে যে ব্যাপারটা আমার কাছে বড়, যাদের গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, যাদেরকে আইকন হিসাবে মানি, তারা আজকে আমার (এবং একই সাথে অগণিত ভক্তের) এই অপকর্মের কারণে গানের জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন এটা আমার জন্য খুবই পীড়াদায়ক একটা ব্যাপার।

তাই আত্মপক্ষ সমর্থন করাটা খুব জরুরী মনে করলাম। আমি নিজের মনের শান্তির জন্য অবসর সময়ে গান শুনি। গান ডাউনলোড করে সেটা বিক্রি করে টাকা নেই না, কারো পেটে লাথি দেয়া বা অডিও ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংসের কোনও অপচেষ্টার সাথেও আমার কোনো যোগ নাই। আমি শুধু একটা ব্যাপার বুঝতে পারি না, অনলাইনে বৈধভাবে গান কেনার ব্যবস্থা কিভাবে করা যায়, এটা কি খুব বেশি কঠিন কাজ? সেদিনের অনুষ্ঠানের পুরোটা জুড়েই অপেক্ষা করেছিলাম হয়তো এই ব্যাপারে কোনও উদ্যোগের কথা বলা হবে, কিন্তু না, কিছু বলা হলো না।

বরং অনুষ্ঠান শেষে শুধু একটা শপথ পড়িয়ে দেয়া হলো – নেট থেকে আর গান ডাউনলোড করবো না। এখন এই শপথটা পড়ে সব বাংলা গান হার্ডডিস্ক থেকে মুছে পাকাপাকি ভাবে ইংরেজি গানের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারি, কিন্তু সেটা করতে চাই না আমি। আমি চাই আবার আগের মতো লাইন ধরে এলআরবি-র অ্যালবাম কিনতে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি, কোটি কোটি ভক্ত ঠিক একইভাবে বিষয়টা ফিল করে। তারা কেউ সিডর বা আইলাতে ভেসে চলে যায়নি। ঠিক এই কাজটাই তারা চায় অনলাইনে করতে। জানি কিছুদিন (অথবা কয়েকটি বছর) অপেক্ষা করলে আপনাতেই এরকম কিছু একটা দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু এখন আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে কি সে কাজটাই আজকে (অথবা এই মাসে বা এই বছরেই) করে ফেলা সম্ভব?

আশাবাদী মন নিয়ে অপেক্ষায় বসলাম, হয়তো এখনই, আজ রাতেই শুনতে পাবো কোনো আশার কথা। হয়তো শীঘ্রই এই ব্যাপারটার একটা রফা হবে এবং শিল্পী ও শিল্পকে হত্যা চেষ্টার ভয়াবহ দায় থেকে আমাকে (এবং একই সাথে অগণিত সঙ্গীত পাগল জনতাকে) মুক্তি দেয়া হবে।

Advertisements

3 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s