মুজাহিদের আত্বপক্ষ সমর্থনের ভাষা আর তা নিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

১৯৭১ সালে জামায়াতের ছাত্র শাখা ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রেসিডেন্ট এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আলবদর বাহিনীর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মুজাহিদের দাবি, ‘‘১৯৭১ সালে আমি ছাত্র ছিলাম। ছাত্র হিসেবে, ছাত্র সংগঠন হিসেবে আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।’’

—————–       ———-        —————–

গতকালকের বাংলানিউজ২৪ এর একটা রিপোর্ট এটা। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের বিপরীতে এই কথা বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ। সোজা কথায় তিনি কবুল করেই নিয়েছেন যে ইসলামি ছাত্রসংঘ সে সময় স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলো, এবং মুজাহিদ সাহেবের তাতে হয়তো সমর্থন ছিলো, অথবা হয়তো ছিলো না, কিন্তু সংগঠনের বাইরে যাওয়া তার পক্ষে অসম্বব ছিলো।

এটা গেলো সেই ১৯৭১ সালের কথা। তখনকার সময় আর এখনকার সময়ের ভেতর যোজন যোজন ফারাক। তখন মুজাহিদ ছাত্র ছিলেন, যাকে বলে একেবারে টগবগে যুবক, আর এখন তিনি রীতিমতো একজন বয়স্ক মানুষ। তখন দেশের নাম ছিলো পাকিস্তান, তার সামনে কেউ বাংলাদেশের নাম নিলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ঝাঁঝালো বিবৃতি দিতেন, “সব বাতিল শক্তির চক্রান্ত!” বলে টেবিলে সজোরে চাপড় মারতেন। আর এখন জননী জন্মভূমি সোনার বাংলাদেশ বলে মাটি তুলে চুমা খান। তখনকার প্রায় সবকিছুই এখন পরিবর্তন হয়ে গেছে। ভোটের বাজার ধরে রাখার তাগিদে জামায়াতের মতো দলও এখন আর ‘আল্লাহর আইন’ কায়েম করার দাবী করেনা।

একটা জিনিষের কিন্তু বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। একেবারে একই রকম আছে। আগে যেমন ছিলো ঠিক তেমন। সেটা হলো জামায়াত আর তার ছাত্র সংগঠনের আনুগত্যের অন্ধতা। আমি আপনার সাথে বাজি ধরতে পারি আজ কিংবা একশো বছর পরেও এই সংগঠনের কোনও নেতাকে যদি তার কোনও (অ)কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয় সে গলা নির্মোহ ভঙ্গিতে বলবে, “সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাকে এটা করতে বলা হয়েছে আমি কি করবো!”।

আসলেই তো, বেচারা ইসলামী আন্দোলন করতে নেমেছে। মওদুদির চটি বই পড়ে সে জানতে পেরেছে যে, মুসলিমদের জন্য সংগঠন করা ওয়াজিব (হযরত উমর রা এই কথাটা কিন্তু আসলেই বলেছিলেন, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সংগঠন বলতে  নিঃসন্দেহে তিনি শিবিরকে বুঝান নি)। বিদেশি চক্রান্ত আর সেক্যুলারিজমের ফাঁদে পড়ে দেশ ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। এই দেশে ইসলাম কায়েম করতে হলে সংগঠনের খিদমত করতে হবে, ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তাই সংগঠনের পক্ষ থেকে যদি কিছু বলা হয়, এর একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে, ঠিক বেঠিক নিয়ে মনে খটকা লাগলেও, কাজটা সে কেন করবে না?

আজকে এক বন্ধুর সাথে আড্ডা হচ্ছিলো, তখন ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ আসলে সে বলে উঠলো, “আচ্ছা! যারা শিবির করে তারা এরকম ব্রেন ওয়াশড হয়ে যায় কেন?” আমি মনে মনে হাসলাম। শিবিরের কর্মীদের নেতৃত্বের স্তর ভেদে একটা করে সিলেবাস আছে, তাতে রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হয়। সিলেবাস মানে হলো মূলত মওদুদির বইয়ের একটা লিস্ট, সেই লিস্ট ধরে বই পড়ে পড়ে পরীক্ষা দিতে হয়। যে যত বই পড়েছে সে তত উপরের নেতা। কেউ ক্রম ভেঙ্গে উপরের বই পড়ে ফেলছে কিনা সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়। ভার্সিটিতে যখন প্রথম ভর্তি হয়েছি, নামাজ টামাজ পড়তে দেখে শিবিরের এক বড় ভাই ভেবেছিলেন আমাকে দলে টানা যায় কি না। তো কথায় কথায় একবার আল জিহাদ বইটা চেয়েছিলাম, উনার উত্তর ছিলো এরকম, “এটা তো অনেক উপরের বই, পড়ে কিছুই বুঝবেন না” পরে এই বইটা আমি নেট থেকে নামিয়ে পড়েছিলাম। বলাই বাহুল্য সহজ সরল বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা বইটা বুঝতে আমার কোনও সমস্যা হয়নি, আর সেই বড় ভাইয়ের মুখের উৎকণ্ঠটাও চোখ এড়ায় নি।

আমি কিন্তু বই পড়াকে খারাপ বলছি না, এটা খুবই ভালো একটা ব্যাপার যে একটা ছাত্র সংগঠন কর্মীদেরকে এভাবে বই পড়ায় উৎসাহদান করছে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদের ওই প্রবচনটা কি মনে পড়ে? উনি বলেছিলেন, এক বই পড়া লোকদের থেকে সাবধান। কৈশোর থেকে যে ছেলেটা শুধু মওদুদীর বই পড়েই বড় হলো, তার কাছ থেকে আপনি কোন আক্কেলে মুক্তচিন্তা আশা করেন? সারাজীবন ধরে একটা ছেলে জেনে আসলো যে মুসলিম কবি নজরুলের খ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথ চক্রান্ত করে হিন্দু একটা মেয়ের সাথে তার সম্পর্ক করিয়ে দিয়েছিলেন (বহুশ্রুত শিবিরীয় অপপ্রচার)। গীতাঞ্জলীর মর্ম তাকে আপনি কিভাবে বোঝাবেন?

যুদ্ধপরাধের বিচার তো হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো শিবির নামের এই যন্তর মন্তর ঘরের হাত থেকে জাতিগতভাবে আমাদের কি আদৌ রেহাই মিলবে?

না তাদেরকে কিছুতেই বুঝানো যাবে না, তাদের সাথে তর্ক করা বৃথা। ওই সিলেবাসের ভিতর যতক্ষণ সে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে শিবিরের ভিতর গণতন্ত্র দেখবে, ইসলাম দেখবে। কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হয় সংগঠনের সদস্যদের ভোটে। কিন্তু সদস্যরা তো নির্বাচিত প্রতিনিধি না, তাহলে তারা সাধারণ কর্মীদের পক্ষে ভোট দেয়ার অধিকার পেলো কিভাবে? শিবিরের ভিতরে এসব ‘কুতর্ক’ কখনো ওঠে না, উঠতে দেয়া হয় না। কম্যুনিটি ব্লগগুলোতে তাদেরকে ছাগু বলে ডাকা হয়, তার অন্যতম কারণ শিবির কর্মীদের একপেশে চিন্তাভাবনা আর মুখস্থ যুক্তি।

“যখন বলবে তখন, যেখানে বলবে সেখানে, যেভাবে বলবে সেভাবে” হুবহু এই কথাটা ছাত্রশিবিরের সাথীদেরকে তোতাপাখির মতো মুখস্থ করানো হয়। আপনার যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয়, শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত এমন কোনও কাছে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। যদিও এইসব গুপ্ত মন্ত্র, বাইরের লোকদের কাছে ফাঁস করা হারামের চেয়েও গুরুতর অপরাধ।

তাই চল্লিশ বছর পরে আজও শিবিরের কর্মীরা তখনকার ছাত্র সংঘের নেতা মুজাহিদের মতোই অসহায়। ইসলামের সোনালী যুগের আদলে এখনো তারা কোনও কাজ করার আগে ওহীর অপেক্ষা করেন, তবে এই ওহী মহান আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে আসে না, আসে উপরের সারির নেতাদের থেকে। গণতান্ত্রিক সংগঠনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটার সিদ্ধান্ত আসবে তৃণমূল থেকে। কিন্তু এটার চর্চা যদি তাদের ভেতর থাকতো তাহলে তো আর তারা একাত্তরে গন বিরোধী ভূমিকা নিতো না, আর মানুষও তাদের রাজাকার বলতো না।

এখন বর্তমানের শিবির তাদের পূর্বসূরি নেতাদের অবস্থা দেখে শিক্ষা নেবে নাকি ওহী মোতাবেক তাদের এই উদ্ভট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাবে সেটা তাদের ব্যাপার, তবে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এই বুদ্ধিবৃত্তিক পঙ্গুত্বের শিকার হতে দেবো কিনা তার একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলার আমি মনে করি এটাই উপযুক্ত সময়।

————————————————–

ফুটনোট: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান, রাজ্জাক এবং কাদের মোল্লার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এর পর শিবিরের তখনকার কেন্দ্রিয় সভাপতির সাথেও একটা বৈঠক করেছিলেন তিনি। সেই সাক্ষাতে এসব নেতারা অনেক যুক্তি তর্ক দিয়ে রাষ্ট্রদূতকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন এটা আসলে উদারপন্থী মুসলিমদের নিয়ে গড়া একটা গণতান্ত্রিক দল। উইকিলিকস বলছে সেই বৈঠকের পর রাষ্ট্রদূত এই বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন,

“Jamaat’s closed-door majlish and our meetings with Jamaat and Shabbir indicate that the organizations remain hierarchical with top-down decision making, despite their claims that they are internally democratic.

Advertisements

6 comments

    • হ্যা ভাই, এদের সবকিছু মুখস্ত। তাই কথা শেষ হয়ে গেলে শুধু চেচামেচি-ই করতে পারে।

      হযরত আলী (রা) একটা কথা বলসিলেন যে, জ্ঞানী লোকের সাথে বিতর্ক করলে জ্ঞান বাড়ে, যুক্তিবোধ তীক্ষ্ণ হয়, আর আহাম্মকদের সাথে বিতর্ক শুধু ঝগড়া আর শত্রুতাই পয়দা করে।

      এই কথাটা ওদের জন্যে বিশেষভাবে প্রযোজ্য 😐

  1. এদের সাথে কোন কিছু নিয়ে তর্ক কইরা লাভ নাই । ২/১ লাইন পর তারা ল্যাদানি শুরু করে । এরা এদেশের জন্ম চাইনি ! এদেশে এদের রাজনীতি করার অধিকার দেওয়া বস্তুত অর্থহীন ।

    • আমাদের দেশে এরা যেভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে, তার নজির বিশ্বে কোথাও নাই। জার্মানী, ইতালি এসব দেশে নাজি-ফ্যাসিস্টদের অনুকরণে পোষাক পরা পর্যন্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

    • অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ব্লগটা ভালো লেগেছে জেনে খুশী হলাম। যদিও ইদানিং লেখালিখি হচ্ছে না তেমন একটা, তাও আশা করছি শীঘ্রই আবার নিয়মিত পোস্ট দিতে পারবো 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s