এইডসের ভ্যাকসিন: আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে আমাদের?

পিচ্চিকালে দশটার খবরের পর মাঝে মধ্যে বিটিভিতে একটা গান দেখানো হতো, আর সেটা শুরু হলেই আমি ভয়ে একেবারে জড়োসড়ো হয়ে যেতাম। এটা ছিলো মারণ ব্যাধি এইডস নিয়ে সচেতনতা মূলক একটা গানের ভিডিও। যেখানে নিশ্চিত মৃত্যুর এই রোগকে দেখানো হতো একটা কালো বিড়াল রূপে। গানটার শুরুর দিকের কথাগুলা ছিলো এরকম,

শোনো মানুষ..শোনো মানুষ..
এসেছে এসেছে পৃথিবীতে,
এক মহারোগ।
সাবধান, মৃত্যুই তার শেষ পরিণাম..

এমনিতেই কালো বিড়াল প্রাণী হিসেবে একটু ভয়ংকর টাইপের। বলা হয়ে থাকে যে একটা বিড়াল নাকি মোট নয়বার মৃত্যুবরণ করে। অনেকে আবার বলে জীনরা নাকি মাঝে মাঝেই বিড়ালের রূপ ধারণ করে লোকালয়ে আসে। ছোট একটা বাচ্চাকে ভয় পাওয়ানোর জন্যে সামান্য এই দুইটা তথ্যই তো যথেষ্ট, গানটার বদৌলতে এর সাথে আবার যোগ হয়েছিলো বিড়ালের এইডস রূপী চরিত্র। ফলাফল ছিলো এরকম যে, বিড়াল আর এইডস এই দুইটা জিনিষের নাম শুনলেই তখন কেঁপে কেঁপে উঠতাম।

ভাইরাস সনাক্তের পর দুই যুগের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনও প্রতিকার সম্ভব হয়নি মরণ ব্যাধি এইডসের

যাই হোক শৈশবের এই অহেতুক ভীতিকর ব্যাপারটা সম্পর্কে একটু ভালোভাবে জানতে পেরেছিলাম স্কুলের গণ্ডিতে থাকতে থাকতেই। কোন ক্লাশে যেন এইডস, ক্যান্সার, জন্ডিস এইসব রোগের কারণ লক্ষণ আর প্রতিকার নিয়ে একটা চ্যাপ্টার ছিলো। আমরা এটা পড়তাম, আর মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতাম, অজান্তে আবার কোনও টা হয়ে গেলো না তো! মামুন নামে একটা ছেলে পড়তো আমাদের সাথে, একদিন এক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে সে আমাকে বলেছিলো, “জানো! এইডস আর জন্ডিসের সবগুলা লক্ষণ-ই না..আমার ভিতর আছে..এখন কি হবে?” আমার এখন মনে নাই, এই ভয়াবহ ব্যাপার জানার পরে ঠিক কি বলে বন্ধুকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম। তবে এটা মনে আছে যে মাথামোটা ওষুধ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য করে ওইদিন বেশ কিছু অশ্রাব্য গালি দিয়েছিলাম। কেন যে তারা এখনো এইডসের কোনও টিকা বের করতে পারছে না! বাকী সব রোগের ওষুধ থাকলে এইডস এর থাকবে না কেন!

এখন কিছুটা বড় হয়ে যাওয়ার পর, অনেক কিছুই বুঝতে পেরেছি। কেন টিভিতে বার বার ওই গানটা দেখানো হতো, স্কুলের পাঠ্যবইতে এইসব রোগের কারণ-লক্ষণ আর প্রতিকার এতোটা গুরুত্ব দিয়ে কেন পড়ানো হতো, এমনকি কোনও রোগের লক্ষণ পড়ার সময় কেন মনে হয় আমার সেই রোগটা হয়েছে – এর সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যাও জানি এখন। কিন্তু প্রায় তিরিশ বছরের প্রচেষ্টার পরও এইচআইভি ভ্যাকসিন এখনো আলোর মুখ দেখতে পারলো না কেন- এই প্রশ্নের উত্তর আজো  পাইনি।

আকোয়ার্ড ইমিউন ডিফিসিয়েন্সি সিনড্রোম বা এইডস রোগটা সম্পর্কে আমরা প্রায় সকলেই কমবেশি জানি। যে ভাইরাসের কারণে এই রোগটা হয় তার নাম এইচআইভি। ১৯৮৪ সালের এপ্রিলে বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম এই ভাইরাসটিকে সনাক্ত করতে সক্ষম হন। আর সে বছর-ই মার্কিন সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়, খুব শীঘ্রই..হয়তো বছর দুয়েকের ভেতরেই ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক ব্যাবহার শুরু হবে। সেদিন থেকেই ভ্যাকসিনের আশায় বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছিলো কাউন্টডাউন, কখন আসে! কখন আসে!

কিন্তু তারপর ২৮ বছর চলে গেছে, এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনও প্রতিকার সম্ভব হয়নি এই রোগের। এই সময়ের ভেতর এইডসে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৫ মিলিয়ন মানুষ। বিংশ শতাব্দীর এই উৎকর্ষের যুগেও এসেও এই রোগের মরণ ছোবলে উজাড় হয়ে যাচ্ছে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অগণিত শহর আর গ্রাম। এদিকে বিজ্ঞানীরাও তো চুপ করে বসে নাই, এইচআইভির বিরুদ্ধে তাদের নিরন্তর যুদ্ধ চলছে। কিন্তু এতোকিছুর পরও সাফল্য না আসার পেছনে তারা দায়ী করছেন এই ভাইরাসের অদ্ভুত রকমের জটিল চরিত্রকে।

ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে ব্যার্থতার পেছনে বিজ্ঞানীরা দায়ী করছেন এইচআইভি ভাইরাসের জটিল গঠন আর রহস্যময় চরিত্রকে

জটিলতার দিক দিয়ে অন্যান্য যে সব ভাইরাসের ভ্যাকসিন বের করা সম্ভব হয়েছে তাদের সাথে এইচআইভির কোনও তুলনাই হয় না। মানুষের শরীরে প্রবেশ করা মাত্রই অস্বাভাবিক হারে এটা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। একটা দুইটা হলে কথা ছিলো, হাজার হাজার লাখ লাখ প্যাটার্নে একে একে সারা শরীরে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে ভাইরাসটি। সংক্রমণের এক মাসের ভেতরেই ভাইরাসের সংখ্যা মিলিয়নের ঘর ছাড়িয়ে যায়। মাঝে মাঝে টিভিতে বা পত্রপত্রিকায় আমরা যেসব ভ্যাকসিনের কথা শুনি, সেগুলো এদের কিছু কিছু প্যাটার্নকে ধ্বংস করতে পারে মাত্র, কিন্তু দেহকে সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা এখন পর্যন্ত কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ভ্যাকসিনের কাজ কি আসলে? এর কাজ হলো দেহের ভেতর অ্যান্টিবডির একটা ব্যারিকেড তৈরি করা। যাতে করে বাইরে থেকে কোনও ভাইরাস অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালালে সাথে সাথে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেহকে সুরক্ষিত রাখা যায়। এইচআইভিকে নিষ্ক্রিয় করতে ভ্যাকসিন গুলোর প্রথম কাজ হচ্ছে জিপি১২০ নামের বিশেষ এক প্রোটিন অণুকে খুঁজে বের করা যাকে এইচআইভি মানবকোষকে আক্রান্ত করার জন্য ব্যাবহার করে থাকে। তাই তাত্ত্বিকভাবে একে সনাক্ত করলেই কাহিনী খতম হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। একেক সময় একেক রকম অবয়ব নিয়ে জিপি১২০ বার বার-ই সফলতার সাথে এড়িয়ে চলেছে ভ্যাকসিনের কড়া নজরদারি। আবার অনেক সময় বিপদ বুঝলে তিনটা অণু একসাথে হয়ে চারপাশে সুগারের এমন অভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে বসে এটা, যে তখন আর তাকে সনাক্ত করার উপায় থাকে না। এর চেয়েও ভীতিকর ব্যাপার হলো, মাঝে মাঝে এই ভাইরাস উল্টো অ্যান্টিবডির ব্যারিকেডকেই হামলা করে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়, তখন বসে বসে ভাইরাসের সংক্রমন দেখা ছাড়া ভ্যাকসিনের আর কিছুই করার থাকে না।

তারপরও একটা কথা বলা হয়ে থাকে যে, মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা-ই সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন। দেখা গেছে যত মারাত্মক রোগই হোক, হাজারে একটা হলেও কৃত্রিম কোনও পদ্ধতি ছাড়াই আরোগ্যলাভের নজির আছে মানবদেহের। আর এটা সব ভাইরাসের ক্ষেত্রেই সত্য – কিছু মানুষ আপনাতেই সেরে উঠবে, কোনও ওষুধপত্র ছাড়াই। এসব নজির বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উৎসাহিত করে, আশার আলো দেখায়। কিন্তু এইডস একমাত্র ব্যতিক্রম, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ এই ভাইরাস দেহে বহন করছে এবং করেছে। কিন্তু একজনও নিজে থেকে একে তাড়াতে সক্ষম হন নি। জেনেটিক কারণে অনেকের দেহে ভাইরাস কিছুটা মন্থর গতিতে কাজ করে, কিন্তু পুরোপুরি আরোগ্যলাভের একটা নজির পাওয়া যায়নি কোথাও।

এপর্যন্ত এইডস এর তিনটি ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুইটা একেবারেই ব্যর্থ। শেষটা যেটা ২০০৯ সালে পরীক্ষা করা হয়েছিলো তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আশার আলো দেখছেন কিছুটা। থাইল্যান্ডে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের উপর প্রয়োগ করা এই ভ্যাকসিন আসলে দুইটা ভ্যাকসিনের মিলিত রূপ। যদিও ব্যাপারটা নিয়ে খুব উদ্যোক্তাদের ভেতরেও খুব একটা আশা ছিলো না। তারপরও সংক্রমণের ঝুঁকি ৩১% কমিয়ে আনাকে প্রাথমিক একটা সাফল্য হিসেবেই দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

নতুন উদ্ভাবিত কিছু ভ্যাকসিনের পরীক্ষা শুরু হবে খুব শীঘ্রই..

এছাড়া যেহেতু এখন এইচআইভি’র সম্পূর্ণ গঠন বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার, অনেকেই চেষ্টা করছেন এর দুর্বল অংশে আঘাত হানতে পারে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি করতে। সামনের বছর এই ধরণের একটা ভ্যাকসিন পরীক্ষা হওয়ার কথা আছে। আরও একটি উপায় হতে পারে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত কোষ গুলোকে ধ্বংস করে দেয়া। এটা নিয়েও অনেক গবেষক এখন কাজ করছেন। আবার ভাইরাসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে আক্রান্ত মানুষকে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টাও চলছে। যদি ভ্যাকসিন উদ্ভাবন সম্ভব না-ই হয় তাহলে এই পথে এগিয়ে এইডসকে ডায়াবেটিসের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বিকল্প হিসেবে।

আপাতত দেখানোর মতো হাতে আর কিছু না থাকলেও গবেষকরা নিরাশা বাদীদের দলে ভিড়তে একেবারেই রাজী নন। তাদের যুক্তি, পোলিও ভাইরাস সনাক্ত করার পর পঞ্চাশ বছর লেগেছে কার্যকর একটা টিকা উদ্ভাবন করতে, তার উপর ভিত্তি করে আজ আমরা পোলিও মুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন দেখছি। হালে বের হওয়া হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও সময়ের ব্যবধান এক যুগের বেশি। তাই এইডসের মতো রোগের তুলনায় আঠাশ বছর অতিক্রান্ত হওয়াকে খুব একটা হতাশাজনক বলা যায় না। বরং পোলিও, গুটি বসন্ত আর হেপাটাইটিসের মতো সামনের দিনে মরণ ব্যাধি এইডসকেও জয় করবে মানুষ – এই আশায় আমরা বুক বাঁধতেই পারি।

(এইডস নিয়ে একটা লেখা পড়তে গিয়ে মনে হলো এই বিষয়টা নিয়ে বাংলায় খুব একটা লেখা লিখি হয়নি। তাই নিজের মতো করে লিখে ফেললাম। এখানে বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন সাইট থেকে তথ্য আর ছবি ধার করা হয়েছে)

Advertisements

2 comments

  1. অনেক বেশি সুন্দর একটা ব্লগ তৈরি করেছেন। খুব বেশি ভাললাগল। কোথাও মাত্র একজনের ব্যক্তিগত ব্লগ হয় অসাধারণ সুন্দর- আর কোথাও বিশাল কম্যুনিটির ব্লগে হাস্যকর ডিজাইন-অপশন ফল্ট। … লেখাগুলো পড়ব।

    • অনেক ধন্যবাদ ভাই 🙂 আসলে কম্যুনিটি ব্লগ গুলার গ্রুপিং আর মডারেশনের
      চিপায় এই ব্লগটাই একমাত্র জায়গা যেখানে নিজের মতো করে সবকিছু করতে পারি 🙂 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s