আমার নাস্তিক শিক্ষকেরা

ছোটবেলা থেকে এমন একটা পরিবেশে বড় হয়েছি যেখানে ধর্ম আর নৈতিকতার বড় একটা প্রভাব থাকলেও রক্ষণশীলতার কোনও স্থান ছিলো না। একারণে বিভিন্ন মত আর পথের সাথে খুব অল্প বয়সেই পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। হাইস্কুলের গণ্ডী পেরুনোর আগেই বিভিন্ন ধর্মীয় বই পুস্তকের পাশাপাশি অনেক অ-ধার্মিক বই পড়ারও সুযোগ হয়েছিলো। এই ধরণের বই যখন পড়তাম, মনে মনে ভাবতাম এরকম মানুষ-ও আছে দুনিয়াতে? মাঝে মাঝেই বিভ্রান্ত হয়ে যেতাম, মনে হতো অপরিচিত এইসব যুক্তিগুলো যেন মনের দেয়াল ভেঙ্গে দিচ্ছে একটা একটা করে। আবার অনেক সময় মনে হতো, ধুর! সব-ই কথার কথা।

 প্রচুর বই পড়ায় একটা সুবিধা হয়েছিলো – সেটা হলো বিভিন্ন মতবাদ সম্পর্কে বই পড়ে আগেই জেনে যাওয়ার ফলে কথা শুনলে বুঝতে পারতাম কে কোন দিকে প্রসঙ্গ টানছে। যাই হোক আসল কথায় আসি, ধর্ম আর অধর্ম নিয়ে বহু গবেষণা করে আসল পড়াশুনার বারোটা বাজিয়ে দিলেও, স্কুলে পড়ার সময় কখনো কোনও নাস্তিক শিক্ষকের মুখোমুখি হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। অথবা এমন হতে পারে হয়তো অনেকেই ছিলেন এরকম, বাচ্চা ছেলে ভেবে আমাদের সামনে সেটা প্রকাশ করেননি।

..পড়া শেষ হওয়ার পর বইখাতা গুছিয়ে শুরু হয়ে যেত জমজমাট আড্ডা

তবে এসএসসি পরীক্ষার আগে যখন সমীর স্যারের কাছে ফিজিক্স প্রাইভেট পড়া শুরু করলাম, খেয়াল করেছিলাম বিগ ব্যাং তত্ত্ব পড়ানোর সময় তিনি প্রায়ই বিভিন্ন ধর্মের প্রসঙ্গ তুলে আনতেন, আর তারপর যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইতেন ধর্মগ্রন্থগুলোতে লেখা কথা আর বিজ্ঞানের তত্ত্বের ভেতর ফারাক অনেক। প্রাইভেটে যখন আরও বেশী সময় উনার সাথে কথা বলার সুযোগ হলো, তখন বুঝতে পারলাম উনি আসলে ধর্মে বিশ্বাস করেন না। স্যারের যে ব্যাপারটা আমাকে সেসময় প্রভাবিত করেছে সেটা হলো বিরুদ্ধ মতকে জানার চেষ্টা করা। আমার মনে হয় এখনো উনার বুকশেলফ ঘাঁটলে ফিজিক্সের যতগুলো বই পাওয়া যাবে তারচেয়ে বেশী পাওয়া যাবে কুরআন, হাদিস, বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থ।

ক্লাশে মাঝে মাঝে উনার ছাত্ররাই বলতো, “স্যার, আপনি যেসব কথা বললেন, এগুলা কেউ যদি হাট-বাজারে বলে, আমরা দেখা যাবে তাকে মেরেই বসবো।” এসব শুনে উনার কোনও ভাবান্তর হতো না, স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেন। পূজার সময় অনেকেই উনাকে জিজ্ঞেস করতো, “স্যার আপনি তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, তাহলে কেন পূজা করছেন??” স্যারের যুক্তি ছিলো, “যে পরিবেশে বাস করি সেখানকার সামাজিকতা তো মেইন্টেইন করতে হবে – তাই না?” শুনেছিলাম শিবিরের কিছু ছাত্র নাকি একবার উনাকে একা পেয়ে পিটিয়ে বস্তাবন্দী করে ফেলে গিয়েছিলো, তবে এটা শোনা কথা, সত্যি মিথ্যা জানি না।

কলেজে উঠার পর প্রথম ক্লাশটাই ছিলো যাকে বলে একেবারে মার মার কাট কাট। বাংলার এক টিচার, উনি আমাদের অরিয়েন্টেশন ক্লাশে অনেকক্ষণ ধরে বোঝালেন বিজ্ঞানের ছাত্রদের আসলে ধর্ম-টর্ম থাকতে নেই, ধর্ম মানতে গেলে বিজ্ঞান বুঝা যাবে না। এরপর উনাকে আর কখনো দেখিনি, এমনকি উনার নাম-ও জানা হয়নি কখনো, তবে একটা যুক্তি বেশ মনে ধরেছিলো। সেটা হলো, দুই অণু হাইড্রোজেন এর সাথে এক অণু অক্সিজেন বিক্রিয়া করলে পানি পাওয়া যায় – যে ছেলে এটা বইতে পড়ে বিশ্বাস করেছে, আর যে এটা নিজে ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখেছে, দুইজন কখনোই সমান হতে পারে না। বিজ্ঞান প্রমাণ নির্ভর, তাই এর সাথে ধর্মের ফারাক যোজন যোজন।

বিজ্ঞান বনাম ধর্ম – এই বিতর্কটা প্রায়-ই জমে উঠতো বিভিন্ন আড্ডায়। তবে খুব বেশিদিন এটা আমাকে আলোড়িত করতে পারে নি। কারণ একটা ব্যাপার বুঝেছিলাম, বিজ্ঞান কখনোই মহাবিশ্বের সৃষ্টি, মানুষের উদ্ভব, মৃত্যুর পরবর্তী জীবন – এই সব বিষয় নিয়ে অকাট্য প্রমাণ হাজির করতে পারবে না। আর করলেও ধর্ম তার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই নিজেকে পরিবর্তন করবে, হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই টিকে আছে এসব বিশ্বাসগুলো, আমরা শুধু শুনতে পারি আর বলতে পারি, তাই এটা নিয়ে এগিয়ে খুব একটা লাভ হবে না কারোর-ই, তবে যে কোনও গোঁড়ামীর মুন্ডুপাত করাটা অবশ্যকর্তব্য।

আরেকজন স্যার পেয়েছিলাম কলেজ লাইফে- সাঈদ স্যার। উনাকে ঠিক নাস্তিক বলা যায় না, কারণ তিনি নিজে কখনো সেটা স্বীকার করেননি। তবে প্রগতিশীল চিন্তাধারার ছিলেন, কথা প্রসঙ্গে ধর্মের সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। স্যারের কাছে আমরা কেমিস্ট্রি আর ম্যাথ দুইটাই পড়তাম, তাই বলতে গেলে প্রতিদিনই যেতে হতো উনার বাসায়, আর পড়া শেষ হওয়ার পর বইখাতা গুছিয়ে শুরু হয়ে যেত জমজমাট আড্ডা। রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম – কি নাই! স্যার পড়াশুনা করেছেন ভারতে, বোধহয় সেকারণেই উনার অত্যধিক ভারত প্রীতি ছিলো। আমরা ইচ্ছা করেই ভারতকে খোঁচা মেরে কথা বলতাম, আর সেটা শোনামাত্র স্যার আবার পালটা যুক্তি দিতেন, এভাবে চলতে থাকতো যুক্তি-পালটা যুক্তির পালা। আবার হাসি ঠাট্টাও কম হতো না, কোনও কৌতুক বলার পর ওই কৌতুকটা শুনে যতটা না হাসি আসতো, তারচেয়ে বেশী হাসি আসতো সেটা বলা পর স্যারের টেবিল চাপড়ে চাপড়ে হাসা দেখে। 

তবে আমাদের এই আড্ডা ছয় মাসের বেশি চলতে পারেনি। ঝামেলা শুরু হয়েছিলো আমাদের এক সহপাঠীকে নিয়ে। স্যার আমাদের বলেছিলেন, কালকে বিকালে আমার কিছু কাজ আছে, তোমরা বরং পরের দিন এসো। আমাদের মধ্যে থেকে একজন বলেছিলো, ইনশাল্লাহ। কেন জানি সেদিন স্যার এটা শুনে একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, “এইসব কথা আমার সামনে বলবা না, যারা পরমুখাপেক্ষী তারাই এগুলা বলে..” ইত্যাদি হাবিজাবি। আমি ভাবলাম যার ইনশাল্লাহ বলার সে বলবে, যার না শুনার সে না শুনবে – এটা নিয়ে এতো কথা বলা হচ্ছে কেন! আমিও কথা বলা শুরু করলাম, অনেকক্ষণ কথার পর একটা পর্যায়ে মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো, যে সমাজে আছি তার সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করাই ভালো, আর কেউ পশ্চিমাদের মতো থাকতে চাইলে তার সেখানে চলে যাওয়াই মঙ্গল।

এই কথার পর আর কথা এগোয়নি সেদিন, পরের দিন যখন গেলাম, স্যার বেশ নাটকীয় ভঙ্গীতে বললেন যে, তিনি এই ব্যাচটাকে ডিসলভ করে দিবেন বলে ঠিক করেছেন। পরে শুনেছি কয়েকজন নাকি আবার গিয়ে স্যারের কাছে পড়েছে, তবে আমরা যারা কথা বলতাম – তারা আর ওই পাড়া মাড়াইনি, এর চেয়ে নতুন স্যার খুঁজে বের করে পড়তে লেগে যাওয়া সমীচীন মনে করলাম।

এভাবে স্কুল আর কলেজের পাঠ চুকানোর পর, এখন এমন একটা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি, সেখানে নাস্তিক-তো দূরের কথা, অমুসলিমদের-ও শিক্ষক হিসেবে কখনো নিয়োগ দেয়া হয় না। যদিও এখন বিজ্ঞান পড়ছি না, তারপরও মাঝে মাঝেই বৈজ্ঞানিকদের আড্ডার ভেতর পড়ে যাই। আর তখন একটা জিনিষ মনে হয়, বিজ্ঞান শিক্ষকদের আসলে উচিত নাস্তিক হওয়া – বিশ্বাসে না হলেও অন্তত কথায়। নাহলে সবকিছুকে অবলীলায় প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করার যে স্বভাব, সেটা আয়ত্ত করা যায় না। আর আমার ধারণা কিছুটা হলেও এই স্বভাব আমি আয়ত্ত করতে পেরেছি, আর তার পেছনের সমস্ত অবদান ধর্মে প্রবল অবিশ্বাসী আমার এইসব শিক্ষকদের।

Advertisements

4 comments

    • না ভাই, আমিও সাবেক অতিধার্মিক মানুষ, এখন সেই “অতি”-টা কাটা পড়েছে বটে, তবে ধর্মকে ধারন করেই আছি এখনো B-)

      তবে ওই শেষ লাইনে যেটা বললাম, মাঝে মাঝে নাস্তিকদের মতো করে চিন্তা করতে পারতে হয়। নাহলে যুক্তির পথে চলা যায় না। যদিও আমি নিজে আস্তিক, তারপরও আমার চিন্তার একটা বড় ভিত গড়ে দিয়েছিলেন এই নাস্তিক শিক্ষকরা। এই লেখাটা আসলে তাদেরকে স্মরণ করারই একটা প্রয়াস ছিলো।

      যাক আমার কথা, আপনার অভিজ্ঞতা শুনতে মন চাইছে, অতিধার্মিক থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত যাত্রার গল্পটা আমাদের জন্য লিখবেন কি? 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s