অ্যান্টি-জিহাদের প্রচারণা: মার্কিন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ‘ইসলামি’ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত মুসলিমরা?

(নাইন ইলেভেন বা টুইন টাওয়ারে হামলার অব্যবহিত পরে আমেরিকানদের ভেতর ইসলাম নিয়ে একধরণের ফোবিয়ার সৃষ্টি হয়েছিলো, সম্ভবত সেই ভীতি বা ফোবিয়া থেকেই অ্যান্টি-জিহাদি এই সব সংগঠনের উদ্ভব হয়েছে, যারা বিশ্বাস করে আল-কায়দা বা এধরণের জঙ্গী সংগঠনগুলো নয়, বরং ইসলাম ধর্মটাই জিহাদের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিচ্ছে আর ইহুদীদের মিত্র হিসেবে এটি একসময় আমেরিকার রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হবে। আর মুসলিম মাত্রই আমেরিকা ধ্বংসের এই গোপন এজেন্ডার অংশ। আমাদের দেশে অনেকে যেমন মোসাদ-র-আইএসআই এর ষড়যন্ত্র নিয়ে হাজারো মিথ বিশ্বাস করেন, এদের বিশ্বাসের ধরনটাও অনেকটা সেরকম।)

৯/১১ এর পর থেকেই আমেরিকাতে শুরু হয়েছে ইসলাম ভীতি

গত বছর আমি ব্লগে এই সময়ে আমি ব্লগে একটি লেখা দিয়েছিলাম ইহুদীদের এক বিশ্ব তত্ত্ব নিয়ে, যেখানে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে ইহুদীদের দীর্ঘমেয়াদী একটা পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিলো। (পড়ুন এক বিশ্ব তত্ত্ব: ভবিষ্যত পৃথিবী নিয়ে ইহুদী পরিকল্পনা) সেখানে এটাও বলা হয়েছিলো যে ভবিষ্যতবাণী নির্ভর এইসব তত্ত্ব-কথা প্রায় সমস্ত ধর্মেই আছে। ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে ছোটবেলাতে ইমাম মাহদীর গল্প শুনেছি, যিনি কিয়ামতের আগে আবির্ভূত হয়ে অনুসারীদের নিয়ে সারা পৃথিবীতে ইনসাফ কায়েম করবেন। এছাড়া প্রায় একই এজেন্ডা নিয়ে হিন্দু ধর্মে উল্লেখ আছে কল্কি নারায়ণ, বৌদ্ধদের মৈত্রেয় বুদ্ধের কথা। কিন্তু আজকে একটা অ্যান্টি-জিহাদ অনলাইন ম্যাগাজিনে দেখলাম তারা আমেরিকা দখলে ইসলামিস্টদের বিশ বছর মেয়াদী একটা প্ল্যান ফাঁস করেছে। তাদের কনসেপ্টটা এরকম, মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে আমেরিকা ইসলামের শত্রু, এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয। তাই তারা ‘নীলনকশা’ তৈরি করেছে আমেরিকাকে দুর্বল করার জন্য। পড়ে বেশ মজাই পেলাম, এই নীল নকশার সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে আনিস সারোস নামের একজন লেকচারার এর বই।

বইটা আমি পড়িনি, তবে সেই বিখ্যাত ‘নীলনকশা’টা এরকম:

  • আমেরিকাকে ইসলামের ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই ঘৃণা আর সন্ত্রাসবাদের ধূয়া তুলে আমেরিকার বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে যতটা সম্ভব সংকুচিত করে ফেলতে হবে, যখন-ই ইসলাম আর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা উঠবে সাথে সাথে এধরনের কথাকে বর্ণবৈষম্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি কথা বলে সাংবিধানিক বিতর্ক উস্কে দিতে হবে যেন ইসলাম বিরোধী মেসেজটা চাপা পড়ে যায়।
  •  লুই ফারাহ খান, জ্যাসি জ্যাকসনের মতো কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের নিয়ে নিগ্রোদের একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন তৈরিতে পৃষ্ঠপোষকতা করা, যারা বিশ্বাস করবে ক্রিসচানিটি শুধু সাদা চামড়ার মানুষদের ধর্ম, আর নিগ্রোদের ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। তাদের এধরণের প্রচারণা কালোদের একটা বিরাট অংশকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করবে।
  •  ইসলামের গুণগান আর স্বরূপ নিয়ে আমেরিকার পাবলিক প্লেস যেমন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এছাড়া চার্চ-মসজিদ সহ কমিউনিটির সমস্ত জায়গায় ছোট ছোট সংলাপ আর বিতর্কের আয়োজন করা, যার ফলে ইসলামের সাথে সন্ত্রাসের সম্পর্ক নিয়ে মানুষের ভেতর যে ধারণা আছে তা ক্রমশ দূর হয়ে যায়।
  • বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অফিস গুলোতে মুসলিম কর্মীদেরকে রিক্রুট করা, এছাড়া সিন্ডিকেট করে সমস্ত নাগরিক কমিটিগুলাতে যদি মুসলিম প্রার্থী থাকে তাহলে তাকে, আর নাইলে ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রার্থীদেরকে বিজয়ী করা।
  • রেডিও, টেলিভিশন, প্রিন্ট মিডিয়া আর হলিউডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাসম্ভব আধিপত্য বৃদ্ধি করা, তাদের মাধ্যমে মানুষের ভেতর ইজরায়েল ও ইহুদী বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালানো।
  • আমেরিকার জ্বালানী যার সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, আর তা দিয়েই এই দেশের সমস্ত কিছু পরিচালিত হয়। তাই ইসলামের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলা যদি কখনো জোট বাঁধে, আর অবরোধ আরোপের হুমকি দেয় তাহলে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলানো মার্কিন সরকারের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার হবে।
  • ইসলামের সমালোচনার জন্য কেউ মুখ খুললেই তার কথাকে অপ্রাসঙ্গিক, হিংসাত্মক, ঘৃণামূলক, আমেরিকা বিরোধী, কুরআনের বিকৃত ব্যাখ্যা, ইহুদীবাদ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করে থামিয়ে দিতে হবে, এবং অনুগত মিডিয়াকে ব্যাবহার করে ক্রমাগত প্রচারণা চালিয়ে জনগণের কাছে তার ইমেজ নষ্ট করে ফেলতে হবে।
  • মুসলমানদের হোয়াইট হাইজের সাথে যথাসম্ভব সম্পৃক্ত করতে হবে, যারা উদারপন্থী ইসলামের ধারণা দিয়ে সরকারকে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল হতে বাধ্য করবে। এছাড়া স্থানীয় স্কুল কমিটি, হেলথ কেয়ার আর রিসার্চ ইন্সটিটিউট, কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় পদ গুলোকে হাত করে ফেলতে হবে যেগুলো সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
  • জনসংখ্যার দিক দিয়ে মুসলমানদেরকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। এটা করার বেশ কয়েকটা উপায় আছে,  প্রতিবছর ইমিগ্র্যাশনের সংখ্যা বাড়ানো (১৯৬১ সাল থেকে প্রতিবছর ১০০০০০ জন করে আসছে), (i) জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বর্জন করা, কারণ মুসলিম পরিবারের সন্তানরা মুসলিম হিসেবেই বড় হয় এবং পরবর্তীতে তাদের অন্য ধর্ম গ্রহণের কোনও সুযোগ থাকে না। (ii) আমেরিকান অমুসলিম নারীদেরকে ব্যাপকভাবে ইসলামের দিকে আকর্ষণ করা এবং তাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। (প্রতিবছর গড়ে ১০০০০ আমেরিকান নারী তাদের মুসলিম প্রেমিককে বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন) (iii)অনগ্রসর আর অবহেলিত কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে খেপিয়ে ইসলামী আদর্শ আর রাজনৈতিক এজেন্ডার সংস্পর্শে আনা, এবং তাদেরকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করা।
  • ইহুদী আর ইজরাইলের প্রতি মানুষের মনে বিদ্বেষ তৈরি হয় এমনসব পরিসংখ্যান, রিসার্চ পেপার আর থিসিস তৈরিতে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে এবং ব্যাপকভাবে সেগুলোর প্রচার প্রসার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ইসলামি স্কুল গুলাতে স্বতন্ত্র শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে, মুসলিমদের ভিন্ন একটা ধারা সৃষ্টি করতে হবে যারা আমেরিকান পরিবেশে বড় হলেও মানসিকভাবে উগ্র আরব মুসলিমদের মতো হবে।
  • ইসলামি চিন্তাবিদ আর স্কলারদের সমন্বয়ে কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলাতে ইসলামিক সেন্টার, আর বিভিন্ন নামে ইসলামী কোর্স চালু করতে হবে আর এভাবেই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
  • উদার ও সহানুভূতি আমেরিকানদের মনে মুসলিম ইমিগ্র্যান্টদের ব্যাপারে সহানুভূতির মনোভাব তৈরি করা এবং তাদের ব্যাপারে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালানো।
  • সচেতন নাগরিকদের ব্যানারে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করে মিডিয়া প্লেস গুলাতে এটা প্রচার করা যে সন্ত্রাসীরা নিজেদের ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করছে, এর সাথে মূলধারার ইসলামের কোনও সম্পর্ক নাই।
  • জঙ্গীগোষ্ঠির নামে ক্রমাগত ভুয়া হুমকি দিয়ে দেশের ইন্টেলিজেন্সকে নাগরিকদের কাছে হালকা করে ফেলা, যেন বড় সড় হামলা হলে কেউ আর তাদের সতর্কবাণীকে পাত্তা না দেয়।
  • শরিয়া আইনের পক্ষে নাগরিক আন্দোলন জোরদার করা, কমিউনিটি গুলোতে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করে সরকারকে সবসময় ব্যতিব্যস্ত রাখা।
  • চ্যারিটির নামে বিশাল অংকের ফান্ড করে টাকা তুলে সেই টাকা দিয়ে দেশের ভেতর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা আর অরাজকতা সৃষ্টি করা।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে অন্তত একটা ইসলাম বিষয়ক সাবজেক্ট নিতে উদ্বুদ্ধ করা, এবং সেই কোর্সের আড়ালে তার মাথার ভিতর ইসলামি আদর্শ ঢুকিয়ে দেয়া।
  • ওয়াশিংটনের বিভিন্ন মসজিদ, ইসলামি শিক্ষা ভিত্তিক সংগঠন, ম্যাগাজিন আর পত্রিকাগুলোর কর্তাব্যক্তিদের সহায়তায় একটা কমিটি তৈরি করা, নিয়মিত বিরতিতে মিটিং এর আয়োজন করা যেন গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সবাই একসাথে কাজ করতে পারে।
  • ইসলাম ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে এমনসব ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে অব্যাহত ভাবে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং যে কোনও উপায়ে তাদেরকে থামিয়ে দেয়া।
  • ভোট প্রদান আর ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম ইমিগ্র্যান্টদের ধীরে ধীরে মূলধারার রাজনীতিতে নিয়ে আসা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে করতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের মতো একটা বড়সড় সিন্ডিকেট তৈরি করা।
সন্ত্রাসবাদের কথা বলে মোটা দাগে প্রচারনা চালানো হচ্ছে ইসলাম ধর্ম আর মুসলিমদের বিরুদ্ধে

এই হলো সেই বিখ্যাত নীলনকশা, বর্তমানে এটা কি পর্যায়ে আছে বা কতদূর বাস্তবায়িত হয়েছে ঠিক জানি না। তবে এটা সত্যি হলে দেখা যাবে, আগামীকাল সকালে উঠেই শুনবো আমেরিকা একটা ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে গেছে আর ইজরায়েল রাষ্ট্রটা সাগরের পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে আমার বিশ্বাস এই ধরণের প্রচারণা মার্কিন সরকারের কোনও উপকারে তো আসবেই না বরং, সেখানে বসবাসরত মুসলিম কমিউনিটি এর কারণে হয়তো নতুন করে বৈষম্যের শিকার হবে। সন্ত্রাসবাদ বিরোধীদের নিয়েই নতুন করে মাথাচাড়া দিবে ইসলাম বিরোধী নতুন সন্ত্রাসবাদ।  একই কাজ করছে হিজবুত তাহরীরের মতো সংগঠনগুলো-ও, তারা একইভাবে ইন্টারনেটকে পুজি করে প্রচারণা-প্রপাগান্ডা চালিয়ে বিপদে ফেলছে নিরীহ ইমিগ্র্যান্টদের।

..তবে সকলেই উগ্রবাদীদের কথায় কর্ণপাত করছেন, তা কিন্তু না

এইসব কথিত জিহাদি আর অ্যান্টি-জিহাদিদের প্রচারণা যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায় সেটাই এখন দেখবার বিষয়।

Advertisements

4 comments

  1. “তবে আমার বিশ্বাস এই ধরণের প্রচারণা মার্কিন সরকারের কোনও উপকারে তো আসবেই না বরং, সেখানে বসবাসরত মুসলিম কমিউনিটি এর কারণে হয়তো নতুন করে বৈষম্যের শিকার হবে।”

    একমত।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s