সম্মোহন নিয়ে হালকা ক্যাচাল

নাছোড়বান্দা এক হিপনোটিস্টের পাল্লায় পড়ে একবার এক শহরের মেয়র ঠিক করেছিলেন শহরের মানুষকে আরও মনযোগী করতে সবাইকে নিয়ে মাসে একবার করে সম্মোহনের চর্চা করবেন। মেয়রের সিদ্ধান্ত বলে কথা! বিশাল একটা হল ভাড়া নেয়ে হলো, শহরের সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আর গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গকে দাওয়াত দেয়া হলো। শো এর শুরুতে সেই হিপনোটিস্ট চেইন লাগানো একটা ঘড়ি বের করে সবাইকে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে বললেন। কথা অনুযায়ী সবাই সেটার দিকে তাকিয়ে অল্প সময়ের ভেতরেই সম্মোহিত হয়ে গেলো। তারা সাজেশন শুনতে আরম্ভ করলো। বসতে বলা হলে বসে, দাড়াতে বলা হলে দাঁড়ায়, হাসতে বলা হলে হাসে, কাঁদতে বলা হলে কাঁদে। হঠাৎ করেই গাইডের হাত ফসকে ঘড়িটা নিচে পড়ে গেলো, অস্ফুট স্বরে গাইড বলে উঠলো, “ওফ শিটট”। এর পরের ঘটনা গল্পে আর কিছু বলা নাই। শুধু জানি, তারপর থেকে সেই শহরে হিপনোটিস্টদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো আর ঐ হলটা পরিষ্কার করে আবার ব্যাবহার উপযোগী করতে সপ্তাহ খানেকের বেশী সময় লেগেছিলো তাদের।

দাদুর বাসার পুরনো আলমারিতে সম্মোহনের উপর লেখা একটা বই পেয়ে, একবার উঠেপড়ে লেগেছিলাম এই বিদ্যা শেখার জন্য। ঘরের দরজা বন্ধ করে মোমবাতি জ্বালিয়ে কতদিন যে ভাব ধরে থেকেছি তার কোনও হিসাব নাই। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি, চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ থাকার পরই হয় ঘুমিয়ে পড়েছি, নাহয় বিরক্ত হয়ে সব বাদ দিয়ে নিজেকে বলেছি, এই সব ফালতু কাজে সময় নষ্ট করে লাভ নাই 😐 যতসব গাঁজাখুরি গাল গপ্পো! এসব না করে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকায় থাকলেও এতক্ষণে দার্শনিক টাইপের কিছু জ্ঞান অর্জন করে ফেলতে পারতাম।

সেই বইটাতে বেশ কিছু অধ্যায় ছিলো। সম্মোহনের জন্য প্রথম যে পাঠ, সেটাতে বলা ছিলো, চোখ বন্ধ করে নিজের হাতকে কমান্ড দিতে। মন পুরা শান্ত হয়ে গেলে তখন হাত এই কমান্ড শুনে নাকি এমনিতেই উপরের দিকে উঠতে শুরু করবে। এভাবে হাত-পা মাথা সবকিছুকেই কমান্ড শুনাতে পারবো।

মাস খানেকের ব্যর্থ প্রচেষ্টা শেষে পেশীর ব্যাবহার ছাড়া একটা আঙ্গুল-ও উপরে তুলতে না পেরে আমি ঐ বইটা এক ছোট ভাইকে দিয়ে দেই। চার পাঁচদিন পর সে বাসায় এসে আমাকে বলে, তার নাকি বেশ কয়েকটা লেসন শেষ হয়ে গেছে। কমান্ড করে হাত-পা উপরে তুলে ফেলতে পারছে সে! 😯 সবকিছু শুনে গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার জন্য ফুসফুসে বাতাস ভরছি, ঠিক এমন সময় সে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা ভাইয়া, ধরেন আমি সম্মোহিত হয়ে গেছি। তারপর যদি আমি হাত, পা, মাথা, পেট, সবকিছুকেই উপরে উঠার জন্যে কমান্ড দেই, তখন কি হবে?” 😐

hypnosis_article

এই প্রশ্নটা শোনার পর থেকে কেন জানি সম্মোহন নিয়ে আর কখনো মাথা ঘামানোর আগ্রহ বোধ করিনি। আর ঐ বইটাও কোথায় হারিয়ে গেছে তার ঠিক নাই। অনেকদিন পর এই নিয়ে একটা লেখা পড়লাম। সম্মোহন নিয়ে মানুষের ভেতর যেসব মিথ প্রচলিত আছে, সেগুলো যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা হয়েছে সেখানে। কয়েকটা পয়েন্ট ইন্টারেস্টিং লাগলো আমার কাছে।

আমরা নাটক সিনেমায় যেভাবে দেখি, একজন লোক ঘড়ির ডায়াল দুলিয়ে দুলিয়ে আরেকজনকে সম্মোহিত করছে। তারপর সেই গাইড যা বলবে সম্মোহিত লোকটাকে তাই-ই করতে হবে (ভুডুর মতো)। এটা নাকি সত্যি না! 😮 সম্মোহনের সময় মানুষের মস্তিষ্ক পুরাপুরি সজাগ থাকে। তাই গাইড যদি এমন কিছু বলে যেটা সম্মোহিতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, তাহলে সাথে সাথে তার সম্মোহন ভেঙ্গে যাবে। বরং সে চাইলে ঐ সময় উলটা ঐ বদমাশ গাইডকে দুই ঘা লাগিয়েও দিতে পারে। 😎

বাজারে আরেকটা কথা প্রচলিত আছে যে যারা সম্মোহিত হয়, তারা একটা পর্যায়ে এসে নাকি পুরোপুরি ভাবে সম্মোহিত হয়ে যেতে পারে। মানে সে সবসময় সম্মোহিত অবস্থাতেই থাকতে পারবে চাইলে। বই খাতায় যা লেখা আছে, তাতে দাবী করা হচ্ছে সম্মোহিত হতে পারলে সেই লোক পরম শান্তি বোধ করে। তাদের ভাষায়, Inner Peace। (আমাকে কেউ এসব বলতে আসলে আমি কুংফু পাণ্ডার মতো বলি, My inner is already super super peaceful) 😎 এই কারণে যারা এই পর্যায়ে যায় তারা মনের শান্তির জন্যে এটা বার বারই করে। কিন্তু সারাজীবন সম্মোহিত অবস্থায় থাকা পুরাই গাঁজাখুরি গপ্পো। (মানুষকে আকর্ষণ করার জন্যে এই ধরনের গপ্পো গুলা অবশ্য বাজারে এরা নিজেরাই ছড়ায়)

“সম্মোহিত হতে পারলে জীবনের অনেক ভুলে যাওয়া অতীত স্মৃতি মনে করা যায়” – এই কথাটা আমার সেই অভিশপ্ত বইটাতে বেশ স্পষ্ট করেই লেখা ছিলো। (আগেই বলেছি এইসব মিথ বাজার ধরার জন্যে ওরা নিজেরাই তৈরি করেছে)। এখন জানলাম এটাও নাকি ভুয়া। 😕 অনেক সময় এরকম হয় না যে অস্থিরতার কারণে জরুরী কোনও বিষয় কিছুতেই মনে পড়ছে না?? এটা অনেকটা সেরকম। সম্মোহনের সময় মাথা সুপার কুল থাকে, তাই মরচে ধরা কিছু স্মৃতি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু যেভাবে দাবী করা হয়…ব্যাপারটা সেরকম সিরিয়াস কিছু না।

———

আসলে এই সব বিভ্রান্তিকর মিথ গুলা বাদ দিলে সম্মোহন একটা ভালো প্রক্রিয়া। এটা করলে আপনি খুব সহজেই কুংফু পান্ডার মতো ‘ড্রাগন ওয়ারিওর’ হয়ে যেতে পারবেন। 😛 (দেখলেন, দুই কলম লিখতে বসে আমি নিজেই মিথ তৈরি করা শুরু করে দিয়েছি!) যা হোক,  এই কয় দিনে লেখালিখিতে বেশ কিছুদিনের গ্যাপ হয়ে গিয়েছিলো, তাই আবার ব্লগ দুনিয়ায় ফিরে আসার তাগিদে আর দীর্ঘ দিনের ব্যার্থতার প্রতিশোধ হিসেবে এই কিঞ্চিত পিন মারা পোস্টের অবতারনা করলাম, আশা করি কোয়ান্টামপন্থীরা এটাকে ব্যাক্রিগত আক্রমন হিসেবে নিবেন না। (নিলেও সমস্যা নাই, ব্লগে হিট তো বাড়বে) 😉

Advertisements

One comment

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s