অদ্ভূতুড়ে সব মতবাদের সংঘর্ষ, আর মাঝখানে পড়ে আইনস্টাইনের বেহাল দশা

উমর

ইন্টারনেটে বসলেই একটা একটা কাজ মাঝে মাঝে করি, সেটা হলো বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের বিভিন্ন উক্তি খুঁজে খুঁজে পড়া। জ্ঞানী ব্যক্তিদের কথাবার্তা পড়ে জ্ঞান অর্জনের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা বলতে পারেন এটাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সন্ধ্যায়  ভাবছিলাম কি সার্চ করা যায়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে ঠিক করলাম, আর কোনও বিশ্বাসঘাতক পলিটিশিয়ান না,  আজকে বরং সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে নিয়ে একটু পড়াশুনা করি 😛 তার মতো একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর কথায় যদি এই অধমের জীবন দর্শনে কিছুটা পরিবর্তন আসে 8) এসব ভাবতে ভাবতে শুরু করলাম খোঁজাখুঁজি।

ছোটবেলা থেকেই আলবার্ট আইনস্টাইনের বোকামিতে ভরা গল্পগুলো শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। ফিজিক্স সম্পর্কে ধারনা পাওয়ার আগ পর্যন্ত চার্লি চ্যাপলিনের চেয়ে বেশী কিছু মনে করতাম না তাকে। তখন তো আর বুঝিনি যে শৈশবের সেই ভায়োলিনওয়ালা বোকা-সোকা বুড়ো লোকটাই থিওরি অফ রিলেটিভিটি কপচিয়ে স্কুলজীবনের শেষ দুই বছর আমার কাছে ‘দুঃস্বপ্নের দেবতা’ হিসেবে আবির্ভূত হবেন! 😕 তবে সেই সময়, অর্থাৎ ক্লাশ নাইনে আমি কিশোরকন্ঠ নামের একটা পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম। সেখানে ধর্ম আর বিজ্ঞান ফরম্যাটের প্রত্যেকটা লেখাতেই আইনস্টাইনের কমন একটা উক্তি ব্যাবহার করা হতো, যেটা এখনও মনে আছে, “Science without religion is lame, religion without science is blind.” অর্থাৎ “বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম গোঁড়া, আর ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান অন্ধ”। এছাড়া পরবর্তী সময়ে ব্লগেও দেখেছি বিজ্ঞান বিষয়ে কোনও রেফারেন্স দরকার হলেই ধর্মতাত্ত্বিকদের প্রথম পছন্দ আইনস্টাইন। 😉 স্বাভাবিক ভাবেই তাই মনের ভেতর এই প্রশ্নের উদয় হলো যে আইনস্টাইন কি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন, নাকি না। তাই প্রথমেই এই ব্যাপারটা নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করলাম।

ঈশ্বরে নিয়ে প্রথমেই তাঁর যে উক্তিটি পেলাম সেটা বলছে, “আমি একটি সুসামঞ্জস্য ও সুশৃঙ্খল বিশ্বে বিশ্বাসী । অনুসন্ধানী মানুষ একদিন বাস্তব সত্যের সন্ধান পাবে এ বিশ্বাস আমি পোষণ করি। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনা যে জগত নিয়ে সৃষ্টিকর্তা পাশা খেলছেন।” ইসলাম ডটনেট ডটবিডি এই উক্তিটা কোট করেছে দি ইউনিভার্স এন্ড ড:আইনস্টাইন থেকে। এছাড়া সৃষ্টি জগত ধ্বংস বা কিয়ামতের সত্যতার ব্যাপারেও তারা আইনস্টাইনের আরেকটি উক্তি ব্যাবহার করেছে যেটা বলছে, “প্রকৃতির সমস্ত দৃশ্য এবং তথ্যাদি দ্বারা এই একমাত্র সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, অনমনীয় ও অপরিবর্তনীয় ভাবে বিশ্ব এক অন্ধকার ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলছে।” এছাড়া তিনি যে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বা নাস্তিক নন তা নিয়ে একটা উক্তি শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্লগগুলোতে। উক্তিটি এরকম, “আমি নাস্তিক নই, এবং নিজেকে আমি অদৃষ্টবাদীও বলি না। আসলে আমরা অনেকটা সেই ছোট্ট বাচ্চার মতো যে শত সহস্র বইয়ের বিশাল লাইব্রেরীতে ঢুকেছে। বাচ্চাটা কিন্তু ঠিক জানে যে বইগুলা আকাশ থেকে নেমে আসেনি, বরং এর প্রত্যেকেরই একজন লেখক আছে। কিন্তু সেই লেখক কে, কেন কিভাবে এগুলো লিখেছে তার সম্পর্কে বাচ্চাটার কোনও ধারনা নাই। সে বইয়ের ভাষাগুলোরও পাঠোদ্ধার করতে পারে না। সে শুধু সন্দেহ করে বইগুলা একটা রহস্যময় ক্রমে সাজানো, কিন্তু সে জানে না সেটা কি। আমার মনে হয় ঈশ্বরকে নিয়ে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সত্তা এভাবেই চিন্তা করে।”

আস্তিকদের প্রতি এই বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীর নমনীয়তা দেখে কিছুটা অবাক হয়েই ভাবলাম, নাস্তিক যারা আছেন, তারা নিশ্চয়ই এই প্রাচীনপন্থী লোকটার এহেন বিশ্বাস নিয়ে প্রবলভাবে বিব্রত। কিন্তু কিসের কি! নাস্তিকদের ব্লগ আর সাইটে আইনস্টাইনের রেফারেন্স গুলা পুরাই উলটা! 😯 এই যেমন ঈশ্বরের ব্যাপারে একটা চিঠিতে not an atheist আইনস্টাইন লিখেছেন, “ঈশ্বরের ধারনাটা এসেছে মানুষের দুর্বলতা থেকে। আমার কাছে ঈশ্বর মানে আর কিছুই না, মানব দুর্বলতার অভিব্যক্তি এবং উৎপাদন ছাড়া।” এছাড়া সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, শেষ বিচার, স্বর্গ নরকের ধারনাকে উড়িয়ে দেয়া তার আরেকটি উক্তি এরকম, “আমার পক্ষে একজন ব্যক্তি ঈশ্বরের কল্পনা করা সম্ভব না যিনি মানুষের কর্মকে সরাসর প্রভাবিত করতে সক্ষম, এবং যিনি তার সৃষ্ট জীবের কৃতকর্মের বিচার করতে পারবেন… নৈতিকতাকে সর্বাগ্রে রাখতে পারি, কিন্তু সেটা আমাদের নিজেদের জন্য, ঈশ্বরের জন্য নয়।”

আশ্চর্য! একদল লোক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, আরেক দল লোক করেনা। অনন্তকাল থেকে তাদের মধ্যে এই বিষয়টা নিয়ে একঘেয়ে বিতর্ক চলে আসছে। আর তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি কি? মহাজ্ঞানী আইনস্টাইনের বাণী! 😐 কিন্তু এই টানাহেঁচড়ার ব্যাপারে আইনস্টাইনের মত কি ছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর পেলাম এই দুইটি বাণী থেকে, “…এখনো কিছু মানুষ আছে যারা মনে করে ঈশ্বর বলে কিছু নেই। কিন্তু রাগ লাগে তখনই যখন দেখি আমারই কোনও কথাকে তারা নিজেদের বিশ্বাসের পক্ষে দলিল হিসেবে ব্যাবহার করছে।” এখানে তিনি নাস্তিকতার পক্ষে প্রচলিত বাণীগুলোকে অস্বীকার করেছেন।

আর আরেক জায়গায় আস্তিকতার প্রতিও একই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এখানে, “এটা একেবারেই বাজে কথা যে আমি ব্যক্তিগতভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, আর আমার দৃঢ় ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা-ও মিথ্যা। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না আর এটা কখনো অস্বীকার-ও করি না বরং স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছি। যদি ধর্ম বলে আমার মাঝে কিছু থাকে তাহলে তা হলো পৃথিবী গঠনের জন্য অসীম প্রশংসা যেটা বিজ্ঞান প্রকাশ করতে পারে।” ব্যাপার যা বুঝছি আইনস্টাইনকে নিয়ে এই দুই পক্ষের টানাটানি উনার জীবনকালেই শুরু হয়েছিলো, এবং ব্যাপারটা নিয়ে উনি বেশ ভালো রকমই বিরক্ত ছিলেন। সম্ভবত তিনি এই অর্থহীন তর্কবাজীর বাইরে গিয়ে নির্মোহ বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেই নিজেকে লিপ্ত রাখতে চেয়েছিলেন।

আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের বাইরে গিয়েও আইনস্টাইনকে খুঁজে পেতে খুব বেশী বেগ পেতে হলো না। আর এবার তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে আমার সামনে হাজির করলো ভূত অনুসন্ধানী গ্রুপগুলা। চিনেছেন এদের? ঐ যে যারা বিভিন্ন পোড়ো বাড়ীর ভেতর যারা ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ডিভাইস নিয়ে ভূত অনুসন্ধান করে বেড়ায়। এরকমই একজন লেখক জন কাসুবা তার বই গোস্টহান্টারে লিখেছেন, “আইনস্টাইন প্রমাণ করেছেন যে সমগ্র বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডে শক্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট। এর সৃষ্টি বা লয় নেই।…এখন আমরা যখন মারা যাই তখন সেই শক্তিগুলা কোথায় যায়? এটার যদি লয় না থাকে তাহলে ড.আইনস্টাইনের কথার সূত্রে আমরা এই শক্তিটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? যদি বলি এভাবে ভুতের সৃষ্টি হয় তাহলে তা কি খুব অযৌক্তিক শোনাবে?” এর অর্থটা কি দাঁড়ালো বুঝতে পারছেন আপনারা? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানকে নাড়িয়ে দেয়া এই বিজ্ঞানী শুধু আস্তিক আর নাস্তিক দের কাছেই না, বরং বর্তমান কালের ভূত বিশ্বাসীদের কাছেও সমানভাবে নমস্য। আর তা হবে না-ই বা কেন? ভূতের অস্তিত্ব সম্বলিত জায়গা গুলোতে যে ইলেকট্রিক ফিল্ড অস্বাভাবিক হয়, এই থিওরিটা তো আইনস্টাইনের কাঁধে ভর দিয়েই দাঁড়িয়েছে! :mrgreen:

নাহ এই উদ্ভট চুলের বিজ্ঞানীটা আমাকে বেশ ঝামেলাতেই ফেলে দিয়েছে, শুরু করেছিলাম বিজ্ঞান আর জীবন দর্শন নিয়ে দুই এক লাইন মহৎ বচন শুনবো বলে। আর বিনিময়ে পেলাম একগাদা ক্যাচাল আর টানাটানি। এই নিয়ে বেশী গভীরে গেলে আবার সাপ বের হয়ে আসাতে পারে। তাই খ্যাতি বিষয়ে এই মহা মনিষীর একটা উক্তি দিয়ে লেখার শেষ টানাই নিরাপদ মনে করছি, “যতই খ্যাতি বাড়ছে আমি দিন দিন ততই নির্বোধ হচ্ছি; সত্যি বলতে কি, এটা আসলে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।” 😀

(আইনস্টাইনের যে সব উক্তি এখানে ব্যাবহার করা হয়েছে সেগুলা সবই গুগল ঘেটে ঘেটে বের করা, তাই রেফারেন্স দিলাম না, বাংলা উক্তিগুলার জন্য সেবা-কে ধন্যবাদ 🙂 ভূতের ব্যাপারে জন কাসুবা যে দাবী করেছেন সেটা অসত্য, বিস্তারিত জানতে LifesLitttleMystries সাইটটা দেখতে পারেন।)

Advertisements

11 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s