মানবতার দোহাই: গবেষণার নামে নিরীহ প্রাণীদের উপর নির্যাতন বন্ধ করুন

উমর

গত বছরের ১৩ই অক্টোবর ছিলো পুরো মানবজাতির জন্য গর্ব করার মতো দিন। এই দিনে সারা বিশ্বের মানুষের জোড়হাতের প্রার্থনা আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে প্রায় দুই মাসের নিরন্তর প্রচেষ্টার পর চিলির একটি খনির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় আটকে পড়া তেত্রিশ জন শ্রমিককে। যে পৃথিবীতে প্রতিদিন যুদ্ধ আর বিভিন্ন সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারায়, সেখানেই সব দ্বন্দ্ব ভুলে কিছু সময়ের জন্য সারা পৃথিবী যেন এক হয়ে গিয়েছিলো সাধারণ কিছু খনি শ্রমিকের জীবন বাঁচানোর জন্য। ঐদিন মধ্যরাতে যখন ফোরেন্সিও আভালোস প্রথম ব্যক্তি হিসেবে উপরে উঠে আসেন, চিলির প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে উপস্থিত মানুষদের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিলো তারা যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছে।

আসলে কিন্তু তাই-ই, ৫ই অগাস্ট অর্থাৎ যেদিন দুর্ঘটনাটি ঘটে সেদিন থেকে উদ্ধারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাবো কিভাবে একটা রাষ্ট্র পরম মমতায় নিজ সন্তানের জীবন রক্ষার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এমনিতেই খনির কাজ অত্যন্ত বিপদজনক, এখানে যারা কাজ করেন মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েই কাজ করেন। প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে খনি দুর্ঘটনায় যত জন শ্রমিক মারা যান সেই পরিসংখ্যানটি দেখলে আমরা সহজেই বুঝতে পারবো যদি এই খনি শ্রমিকদের উদ্ধারের প্রচেষ্টায় সরকার গাফলতি করতো, তাহলেও তাতে বলার বা করার কিছু ছিলো না। কিন্তু দুই মাসের অধিক সময় আর আড়াই কোটি মার্কিন ডলার খরচ করে এই সব শ্রমিকদের উদ্ধার করা এটাই প্রমাণ করে যে প্রতিটা মানুষ আসলে একে অপরের সাথে অদৃশ্য এক বন্ধনে বন্দী, এবং জীবিত কয়েকজন মানুষকে গভীর অন্ধকূপের ভেতর মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দিয়ে আমরা অন্যরা চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।

♦ 2 ♦

উপরের এই কথাগুলা যদি সত্য হয়, তাহলে গতকালের তারিখটি বিশ্ব মানবতার জন্য চরম লজ্জার দিন হিসেবে চিনহিত হয়ে থাকবে। প্রায় তিরিশ বছর ল্যাবরেটরির ভেতর বন্দী থাকার পর একদল শিম্পাঞ্জিকে আজ অস্ট্রিয়াতে অবমুক্ত করা হয়েছে। এইচআইভি আর হেপাটাইটিসের ভ্যাকসিন নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করার জন্য একটি ফার্মাটিউক্যাল কোম্পানি তিরিশটির মতো শিম্পাঞ্জী নিয়ে এই গবেষণাটি শুরু করেছিলো। এরপর ১৯৯৭ সালে গবেষণার কাজ শেষ হয় এবং আলো-বঞ্চিত এই প্রাণীগুলোকে একটি ফার্মে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছিলো কিভাবে এই অসহায় প্রাণীগুলোকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেয়া যায়। এদের প্রায় প্রত্যেকের শরীরেই এইচআইভি পুশ করা হয়েছে, যদিও কেউই পুরোপুরি ভাবে এইডসে আক্রান্ত হয়নি। তবে ঐ ফার্মের সহায়তা প্রায় চৌদ্দ বছরের প্রচেষ্টার পর তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর বারোটার দিকে তারা প্রথম সূর্য্যের আলোয় বাইরে আসতে সক্ষম হয়।

তিরিশ বছর পর বাইরে বের হয়ে আসছে সেই সব শিম্পাঞ্জীরা

তাদের হাস্যজ্জল সেই সময়কার কিছু ছবি দেখে আমি রীতিমতো লজ্জা বোধ করেছি। যত বড় গবেষণা-ই হোক, আর এর কারণে যত মানুষের জীবন-ই রক্ষা পাক, তাই বলে এই সব নিরীহ প্রাণীদের তিরিশ বছর ধরে অমানবিক পরিবেশে আটকে রেখে নির্যাতন করতে হবে? যে কারণে এত কিছু করা হলো তার ফলাফল কিন্তু শূন্য, এইডসের ভ্যাকসিন তৈরীতে কোনও উপকারে আসেনি এই গবেষণা।

মহাত্মা গান্ধী একবার বলেছিলেন, “The Greatness of a society is judged by the way animals are treated.” আমার মনে হয় প্রতিটি সচেতন মানুষের উচিত এই ধরনের অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। হয়তো আমরা এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কিছুই করতে পারবো না। তবুও আসেন, মানবতার স্বার্থে আমরা অন্তত একবার এই ঘটনার পেছনের দায়ী ব্যক্তিদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করি এবং গবেষণার নামে নিরীহ প্রাণীদের ল্যাবের ভেতর অত্যাচার করাকে না বলি।

Photo Courtesy: DAILY MAIL

এই বিষয় নিয়ে আপনি কি ভাবছেন? গবেষণার জন্য প্রাণীদের ধরে এমন দীর্ঘ সময় অস্বাভাবিক পরিবেশে আটকে রাখা কি সমর্থনযোগ্য? যদি না হয়, তাহলে আমরা কিভাবে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারি? কমেন্ট সেকশনে আপনার মন্তব্য জানান।

Advertisements

3 comments

  1. kno na kon valo kajer jonno kauke na kauke to sacrifice kortei hy…. HIV r Hepataitise a proti bosor onek manus mara jay… scientific gobeshonar jonno ae prani gulo k dore rakha hyisilo..r sei gobeshona ta kintu kono maronastro toirir jonno na…
    ae prani gulor proti sohanuvuti amr nai, ta na.. kintu oisb manus gulor proti o ami somobathi jara HIV ba hepataitise a akranto ba mara gese… 2to bisy pasha pashi vable siddanto neoa kothin…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s