সুনামী, ঘুর্নিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস: আল্লাহর আজাব?

উমর

আমরা যখন বরগুনাতে থাকতাম, একদিন আসরের সময় মসজিদে গিয়ে দেখি সাদা পাগড়ী পরা বেশ কিছু মুসল্লি বারান্দায় গোল হয়ে বসে কথা বলছেন। ওজু করে ভেতরে গিয়ে ঢুকতেই তাদের মধ্যে থেকে একজন আমাকে তাদের সাথে বসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। পোশাক আর কথার ভঙ্গিতে বুঝলাম এরা তাবলীগ করতে এসেছে। নামাজের তখনও বেশ কিছুটা দেরী ছিলো, তাই গিয়ে বসলাম। এটা ২০০৪ সালের কথা, আগের বছর ডিসেম্বরে সুনামি হয়ে ইন্দোনেশিয়াতে বহু লোকের প্রানহানী হয়েছে। বয়ানে আল্লাহর কুদরত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুনামি প্রসঙ্গটাও কিভাবে যেন উঠে আসলো। এই যে এত লোকের একসাথে প্রানহানী হলো, তারা কি কখনো ভাবতে পেরেছিলো কিছু সময়ের ব্যবধানে এরকম একটা মনোরম সাগর সৈকতে নারকীয় বিভীষিকা শুরু হয়ে যাবে? বক্তা বলতে চাইছিলেন যে, আল্লাহর পক্ষেই একমাত্র জানা সম্ভব কে কোথায় কিভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হবে, তাই সময়ের অপেক্ষায় আমাদের গাফেল হয়ে থাকা উচিত না।

কি মনে করে আমি হঠাৎ বক্তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলাম যে, ইন্দোনেশিয়ায় হওয়া সুনামিকে তিনি আল্লাহর আজাব বলে মনে করেন কি না। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বললেন আসলে আজাব যে কখন কিভাবে আসে এটা মানুষের পক্ষে চট করে বিচার করে ফেলা সম্ভব না। এটা আজাব হতে পারে, অথবা না-ও হতে পারে। অনেকেই বলছেন যে সৈকতে থাকা ইউরোপীয়দের নোংরামির কারণে ক্রুদ্ধ হয়ে আল্লাহ তাদের শাস্তি দিয়েছেন। এরকম যে হতে পারে তা অস্বীকার করি না, তবে এমনও হতে পারে যে এটা নিছকই একটা প্রাকৃতিক ঘটনা। এতো দূর থেকে শুধু খবরের কাগজ পড়ে আন্দাজে একটা ঘটনাকে আজাব বলে প্রচার করা ঠিক না। বরং আমাদের উচিত এই দেশে এরকম আজাব যেন না আসে তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া, নিজের আমল ঠিক রাখা।

সেসময় আমি ক্লাশ নাইন কি টেনে পড়তাম, অনেকদিন পর এই ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো আজকে। যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার প্রসঙ্গে ব্লগ আর বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্ক গুলোতে অনেক কথা শুনছি। কেউ কেউ এটাকে প্রথম কথায়-ই আজাব বলে রায় দিয়ে দিয়েছেন, কেউ রয়ে সয়ে কয়েক কলম লিখেছেন তারপর মন্তব্য করেছেন এটা আজাব হলেও হতে পারে। যারা আজাব বলে মনে করছেন না, তাদেরও কমেন্ট সেকশনে আজাবপন্থীদের দেখা গেছে আনন্দ করতে। ফেসবুকে নোট লিখে বা স্ট্যাটাস দিয়ে অনেকেই আইরিন আপাকে ফুলের মালা দিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আমার এগুলা দেখার পর থেকেই যেটা মনে হচ্ছে সেটা হলো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বা যাদের উপর আমাদের ক্ষোভ তারা কেউ তো মারা যাবেন না এই ঝড়ে, মারা যাবে আমাদের মতোই কিছু নিরীহ মানুষ, ঠিক যেভাবে আমেরিকা ড্রোন দিয়ে হামলা করে তালিবান নিধনের নামে আফগান সীমান্তে মানুষ হত্যা করে। যারা এই ড্রোন হামলাকে সমর্থন করেন তারা যেমন নিরীহ মানুষ হত্যার কথা কবুল করেন না, আবার ঘূর্ণিঝড় নিয়ে যারা এখন উল্লাস করছেন তারাও এটা মানতে চাইছেন না যে সব কিছুর পর সেখানে কিছু আমাদেরই মতো সাধারণ কিছু মানুষের লাশ পড়ে থাকবে। কোনও ধর্মগ্রন্থে কি এখন পর্যন্ত এমন আজাবের কথা বলা হয়েছে যেখানে জালেমরা বেঁচে গেছে আর মজলুমদের প্রানহানী হয়েছে? তাহলে এরকম একটা মানবিক বিপর্যয়ের ভেতর কেন আমরা ধর্ম বা রাজনীতি কেন টেনে আনছি?

গতকাল এরকম এক বাবার সাথে কথা হচ্ছিলো যার ছেলে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি বলছিলেন ছেলেকে যখন তিনি বলেছিলেন পানি আর শুকনো খাবার কাছে রাখার জন্য। ছেলে তাকে জানিয়েছে তার কাছে বড় কোনও পর্যন্ত বোতল নাই। পরে বড় একটা পলিথিনের ব্যাগ পেয়ে সেটার ভেতর সেই পরিবারটি পানি জমিয়েছিলো। বাবা ফোন রাখার আগে একটা দোয়া পড়ে ছেলেকে বলেছিলেন, এই দোয়াটা বার বার পড়তে, বলা যায় না একজনের দোয়ার উছিলায়ও তো এই তাণ্ডব থেমে যেতে পারে। পরের দিন সকালে আমরা কত লোক মারা গেলো তা জানতে যখন পেপার খুলেছি, একবারের জন্যেও কি চিন্তা করেছি এই ছেলে আর তার বাবার কথা? অথবা তাদের মতো হাজার হাজার পরিবারের কথা, শিশুদের কথা? আমরা কি একটা সুনামি অথবা ঘূর্ণিঝড়ের থেকেও নিষ্ঠুর আচরণ করছি না?

শুরু করেছিলাম তাবলীগের কথা দিয়ে, আর লেখার শেষ করছি স্কুলের ফিজিক্স টিচার সমীর স্যারের কথা দিয়ে। পড়ানোর ফাকে আমাদের একদিন বলেছিলেন, দেখো তোমরা আমেরিকায় একটা খুঁটি পড়ে গেলেই আজাব আজাব বলে চিৎকার করো, কিছুদিন আগে পাকিস্তানে বন্যা হয়ে এতোগুলা মুসলমান যে মারা গেলো এটাকে কি আজাব বলে কেউ? অথবা এই যে বিশ্বের অন্যতম ইসলামি রাষ্ট্র ইরানের বাম নগরী ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে একেবারে মাটির সাথে মিশে গেলো, তখন তো কই, কেউ এটাকে তো আজাব বলে নাই! আমি যদি তখন সেখানে উপস্থিত হয়ে হাসতে হাসতে বলতাম, ঠিকই আছে! আল্লাহ এই এলাকার মানুষকে এভাবে শাস্তি দিয়েছেন। আর তুমি যদি পাকিস্তানী বা ইরানী হতে, তোমার মনের অবস্থা কি হতো তখন? ঈশ্বরের অস্তিত্বে চরমভাবে অবিশ্বাসী স্যারের কোনও যুক্তির সাথেই একমত হইনি কখনো। তবে এই বিষয়টা নিয়ে যখন তিনি কথা বলছিলেন, আমার মনে হয়েছে এই ধরনের শব্দ চয়নের ব্যাপারে আরও সতর্ক হওয়া উচিত আমাদের।

এই বিষয় নিয়ে আপনি কি ভাবছেন? ক্যাটরিনা, রিটা, আর সবশেষে আসা আইরিন কি আসলেই আমেরিকার উপর আজাব? আমেরিকার যুদ্ধবাজ আচরন-ই কি এই বিপর্যয়ের কারন? কমেন্ট সেকশনে আপনার মন্তব্য জানান।

Advertisements

9 comments

  1. ধর্মের নামে উদ্ভট কথা বলা এবং শুনে মজা পাবার ব্যাপারটা আমাদের কাছে আসলে একবারেই নতুন কিছু নয়। আসলে এটা হচ্ছে ধর্মকে মুখোশ বানিয়ে মানবিকতাটাকে নষ্ট করে আমাদের ভিতরের পিশাচটাকে বের কর নি আসবার একটা পন্থা। মাঝে মাঝে তো মনে হয় আমরা যারা সকল ধর্মে বিশ্বাসী মানে যাদেরকে খামোখা অনেকে নাস্তিক বলেও দাবি করে তারা আসলে ঐসব নেকাবধারিদের চাইতে অনেক ভাল অন্তত আমরা ধর্মের নামে তো নিজেদের ভিতরের পিশাচটাকে বের করে নিয়ে আসিনা। আমরাও কিন্তু অনেকে স্রষ্টাকে বিশ্বাস করি; আমাদের সাথে অন্যদের পার্থক্যটা শুধু আমরা ধর্ম দিয়ে মানুষ বিচার করিনা। আসলে আমাদের চাইতে কি এসব নেকাবধারি ধার্মিকরা স্রস্টাকে বেশি সম্মান করে … আমার কিন্তু কখনোই মে হয়না।

    • অগনিত মানুষের মৃত্যু কামনাকারীদের কখনোই ধার্মিক মনে করি না, এরা শুধু নিজেদের বিকৃত মানসিকতাকে প্রকাশ করার জন্যে ধর্ম আর রাজনীতিকে ব্যবহার করছে…

  2. আমি জানি না কারা বা কোন উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রপোগান্ডার সাথে জড়িত । যেই হয়ে থাকুক তাদের উদ্দেশ্য সফল। সবা জায়গাতেই এর সঠিক বা শক্ত কোন রেফারেন্স দেয়া নাই, শুধু লেখা অমুক জায়গা থেকে সংগ্রিহিত । আমাদের জাতি যে মানসিকভাবে কতটা দূর্বল মনের অধিকারী তা মনে হয় প্রমানিত হয়ে গেছে। “মরার আগেই আমরা মরে গিয়েছি” তাই আমার মনে হয় সংগ্রিহিত কোন কিছুর উপরে এত বেশী বিশ্বাস না করাই ভাল। উল্লেখযোগ্য, যে নীল আর্মস্ট্রংকে নিয়ে ৬০দশকে এধরনের প্রপগান্ডা প্রচার করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের সমাজিক চিন্তা ভাবনায় যে এগিয়ে যাচ্ছিল তাকে ফাটল ধরানো । এবং তাদের উদ্দেশ্য আমাদের র্দূভাগ্যের কারনে সফলও হয়েছে।

    • নীল আর্মস্ট্রং এর ওই গুজবটা আমি শুনেছিলাম স্কুলে থাকতে, এরপর অনেকদিন লেগেছে সেই ভুল ভাংতে..আর কতদিন যে বাতাসে ভাসবে এইসব ফালতু গুজব, কে জানে! 😐

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s