একটি নির্জন পোস্ট অফিস

উমর

বাসার বাইরে যেহেতু আগে কখনো থাকিনি তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠার পরেই বাসা থেকে প্রতি মাসে টাকা পাঠানো নিয়ে একটা ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম। এখন ক্যাম্পাসে একটি ব্যাংকের শাখা আছে, কিন্তু তখন এরকম কোনও কিছু ছিলো না। অন্য কোনও উপায় না থাকলে প্রতিমাসে টাকা তুলতে শহরে যেতে হবে। শহরটা যদি চট্টগ্রাম না হয়ে অন্য কোনও জায়গা হতো তাহলে কথা ছিলো, কেন জানি এই শহরটার পথ-ঘাট আমি কিছুই মাথায় নিতে পারি না। আমার ক্ষেত্রে তাই সমূহ সম্ভাবনা ছিলো পথ-টথ হারিয়ে একটা কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ফেলার।

এই নিয়ে যখন আমি বেশ চিন্তিত, তখনই এক এক বড় ভাই দিলেন পোস্ট অফিসের খোজ। ক্যাম্পাসের ভেতরের একটি একতলা ভবনে তিন জন কর্মচারী নিয়ে ছোট একটা অফিস। যোগাযোগ করে জানলাম যে হ্যাঁ! এখানে মানি অর্ডার করা যায়, আর টাকাও রুমে রুমে গিয়ে বিলি করে আসে পোস্টম্যান। আমি তো মহা খুশী! দুই একদিন সময় বেশী লাগতে পারে। প্রয়োজনে পেটে পাথর বাধতেও রাজী, কিন্তু শহরে যাওয়ার হাত থেকে তো বাচা গেলো!

এর পর থেকে এভাবেই টাকা আসতো। প্রথমবার যখন টাকা নিয়ে এসেছিলো পোস্ট ম্যান, আমি তখন বাথরুমে গোসল করছি। টাকা এসেছে শুনে রুমমেট দের কেউ হয়তো হয়তো বলেছে আমি গোসল করছি, সেটা শুনে পোস্টম্যান সোজা ওয়াশরুমে এসে হাজির! সব কিছু বুঝে রুমে এসে টাকা বুঝে নিলাম, কিছু কথাও হলো তার সাথে। ২০০৭ সাল থেকে উনি এখানে চাকরী করছেন। ক্যাম্পাস নিয়ে আলাপ করতেই নস্টালজিয়ার আভাষ পেলাম কথার ভাজে, ধরে আসা গলায় তখনকার বড় ভাইদের কথা বললেন যারা পড়াশুনা শেষ করে চলে গেছেন। এর পর থেকে নিয়মিত ভাবেই টাকা এসেছে এভাবে। তখন চাকরী সূত্রে বাবা নোয়াখালীতে ছিলেন, ছুটি পেলে প্রতি সপ্তাহেই বাড়ী যাওয়ার সুযোগ ছিলো। মাঝে মাঝে অবশ্য তাই বাড়ী গিয়ে নিজেই টাকা নিয়ে চলে আসতাম।

পুরো একটা বছর এভাবেই চলেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটে এক্সিম ব্যাংকের একটি শাখা হলো, কিন্তু আমার পোস্টঅফিস প্রীতি গেলো না। এরই মধ্যে বাবার কর্মস্থল পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় বাসা চলে গেলো বরিশালে, আর টাকা পাঠানোর ব্যাপারটাও বেশ দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার হয়ে গেলো। খোজ নিয়ে সেটারও একটা রফা করলাম। ইলেক্ট্রনিক মানি অর্ডার পদ্ধতি তখন কেবল চালু হয়েছে, সেটার মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ টাকা পাওয়া সহজ হয়ে গেলো। কিন্তু মাঝে মাঝে ক্যাশে টাকা না থাকলে ইদানীং অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয় নাহলে পরে আবার আসতে হয়, যা খুবই বিরক্তিকর।

এরকমই এক দিনে মাসের টাকা তুলতে গিয়ে মোবাইলে এই ছবিটা তুলেছিলাম। তখনই মনে হলো এই পোস্ট অফিস নিয়ে একটা ব্লগ পোস্ট দেয়া যেতে পারে। রসিদ দেয়ার সময় পোস্টম্যান আক্ষেপ করছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেনদেন কম হওয়া নিয়ে। অনেক ছাত্র আবার জানেও না এই অফিসের কথা, তারা নেহাত বাধ্য হয়ে টাকা তোলার জন্য সারাদিন পার করে শহরে যায়। কর্তৃপক্ষ এই অফিসের মাধ্যমে লেনদেন করলে আমাদের ক্যাশ পেতে বিড়ম্বনা কমবে অনেকটা, আর ব্যাংকের শাখা খোলার পর সেমিস্টার ফি যেহেতু এখন এখানেই দেয়া যায়, তাই মাসের টাকা পেতে অযথা দূরে ছুটতে হবে না কাউকে। এই লেখাটি নজরে গেলে আশা করি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন কর্তৃপক্ষ।

Advertisements

8 comments

  1. হাহাহাহা। একটা মজার ব্যাপার কি জানো? আমাদের বেশ কয়েকজন ক্লাশমেট এখনো এই পোষ্ট অফিসের মাজেজার কথা জানেনা। অর্থাৎ তারা মনে করে যে এটা নেহায়েৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়, অন্য কোন কাজে ব্যবহৃত হয়না। আমি তাদেরকে এই পোষ্ট অফিসের মাজেজার কথা বলার তারা তাদের আর্থিক লেনদেন এই পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে শুরু করে।

    উল্লেখ্য, আইআইইউসি স্থায়ী ক্যাম্পাসের এই পোষ্ট অফিসটি উক্ত এলাকার আওতাধীন পোষ্ট অফিস। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে- আর মাত্র কয়েক মাস পর এই পোষ্ট অফিস সহ প্রিয় ক্যাম্পাসটিকে মিস করতে যাচ্ছি। 😦

    যা হোক, তোমাকে অনেক অভিনন্দন পোষ্ট অফিসকে নিয়ে সুন্দর একটা লেখা উপহার দেয়ার জন্য। 🙂

    • ভর্তি ফরম জমা দেয়ার জন্যে যখন প্রথমবার ক্যাম্পাসে আসি, তখন পনির ভাই আমাকে ফ্যাকাল্টি থেকে শুরু করে সব জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। সেসময় উনি আমাকে পোস্ট অফিসটা চিনিয়ে দিয়েছিলেন বলেই রক্ষা, কারন আলী (রা.) হলের পিছনে যে আবু বকর (রা.) হল নামে আরেকটা হল আছে, সেটা জানতেই আমার পুরা এক সেমিস্টার লেগেছিলো 😛 😛

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s