ইমাম হাতেপ স্কুল: তুরস্কের মাদরাসা পরবর্তী যুগে ধর্মশিক্ষা

উমর

শিক্ষানীতি আর বাধ্যতামূলক ধর্মশিক্ষা বনাম নৈতিক শিক্ষা নিয়ে ইতোমধ্যেই আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের ভেতর একপ্রস্ত তর্ক বিতর্ক হয়ে গেছে। কেউ চাইছেন মাধ্যমিক পর্যায়ে ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক, আবার কেউ চাইছেন ধর্মশিক্ষা-ই তুলে দেয়া হোক পাঠ্যক্রম থেকে। অনেকে আবার নৈতিক শিক্ষা নামের একটা বিষয় অন্তর্ভূক্ত করার সুপারিশ-ও করেছেন ধর্মশিক্ষার পরিবর্তে। জানি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই রাজনৈতিক বিতর্কের শুরু বা শেষ কিছুই নেই, তবে সমাধান খুঁজতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো সেই তিরিশের দশকের তুরস্কে। বিপ্লবের পর যখন সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন অনেকটা আমাদের মতোই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলো তারা। সেসময় ইমাম হাতেপ স্কুল নামের একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ঘটেছিলো তাদের সমাজে। সেই হাতেপ স্কুলের কার্যক্রম নিয়েই এই লেখাটি লিখছি।

তুরস্কের হাতেপ স্কুল নিয়ে লেখার ভূমিকায় আমাদের দেশের শিক্ষানীতি ইস্যুর উল্লেখের বিশেষ একটি কারণ আছে। তা হলো, ইমাম হাতেপ স্কুলের কার্যক্রম তুরস্কে প্রথম চালু হয়েছিলো মুসতাফা কেমাল পাশার ‘রক্ষণশীল’ ধর্মনিরপেক্ষতার যুগে। আমাদের দেশের মতো তুরস্কতেও সেসময় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো। আমরা রাজনীতির মাঠে বা টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলের লেট নাইট টকশো-তে হর হামেশাই এই ধরনের ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতি শুনি। এই প্রক্রিয়ার বিরোধীরা-ও গলার জোরে একেবারে কম যান না, তারাও সমান ডেসিবেলে প্রত্যুত্তর দিয়ে থাকেন। কিন্তু তখনকার তুর্কী সরকারের সাথে এদের পার্থক্য হলো, এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সেই দেশে মাদরাসা শিক্ষার সত্যি সত্যিই বিলোপ ঘটাতে সমর্থ হয়েছিলো সেখানকার সরকার এবং Unification of Education Act নামে একটি আইন করে সমস্ত মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল গুলোর জন্য একটি কারিকুলাম বেধে দিয়েছিলো তারা। তবে সরকারীভাবে মসজিদের ইমাম নিয়োগের সময় দেখা যায় বিপত্তি। ধর্মীয় শিক্ষা যদি একেবারেই দেয়া না হয়, তাহলে নগরীর মসজিদগুলোতে ইমামতি করবে কে? আর তাদের যোগ্যতাই বা কিভাবে নিরূপণ করবে সরকার? এই সমস্যার সমাধানের জন্যেই একটি বিশেষ ভোকেশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার নাম দেয়া হয়েছিলো ইমাম হাতেপ স্কুল, বা ইমাম-খতীব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

কিন্তু এই একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর পর অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হয় তুর্কী সমাজে, সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শতগুণ উচ্চমানের সুযোগ সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র ইসলামী বিষয়ের অন্তর্ভুক্তির কারণে ধর্মীয় শিক্ষার উপর আস্থাশীল পরিবার গুলো তাদের সন্তানদের ভর্তি করতে শুরু করে ইমাম প্রশিক্ষণের এই স্কুলে। যেহেতু এই স্কুল থেকে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজেই যেকোনো বিষয়ে উচ্চ শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ ছিলো তাই অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেক্কা দিয়ে একে একে তুরস্কের বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠতে থাকে হাতেপ স্কুলের শাখা। আর একটা পর্যায়ে এসে জনপ্রিয়তায় সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করে এই সব ধর্মীয় স্কুল। ইতিহাসের এই ঘটনাকে কোন বিশেষণে প্রকাশ করা যায়? সরকারের চাপিয়ে দেয়া সেক্যুলার শিক্ষার প্রতি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অনীহা? ধর্মীয় শিক্ষার পক্ষে রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিয়মতান্ত্রিক সমর্থন? নাকি একটি নীরব শিক্ষা বিপ্লব? যা-ই বলা হোক, আজকের হাতেপ স্কুলগুলো এখন আর শুধু ইমাম প্রশিক্ষণের কেন্দ্রই নয়, বরং বিশ্বের উদারপন্থী মুসলিমদের জন্য এক একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটি বলা চলে এগুলোকে।

তুরস্কের একটি হাতেপ স্কুল

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে ভোকেশনাল স্কুল হিসেবে প্রথমে যাত্রা শুরু করলেও এখানকার শিক্ষার পরিবেশ কিন্তু অন্য স্কুল গুলোর থেকে ভিন্ন কিছু ছিলো না, সিলেবাসের ৪০% বরাদ্দ করা হয়েছিলো আরবি, ইসলামী জুরিস্প্রুডেন্স আর অন্যান্য ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়গুলোর জন্য, আর বাকি ৬০% এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো বিজ্ঞান, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো। এই স্কুলের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, মসজিদের ইমাম তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও এখানে শুধু ইসলাম ধর্ম-ই শিক্ষা দেয়া হয় না, বরং খ্রিষ্টান, ইহুদী, বৌদ্ধ সহ অন্যান্য ধর্মের উপরও সমান ধারনা দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের। আবার কোনও শিক্ষার্থী যদি মনে করে সে ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে না পড়ে অন্য কোনও বিষয় নিয়ে সাধারণ স্কুলগুলোতে পড়াশুনা করবে, তবে এই ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে।

এই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাই নজর কেড়েছে সারা বিশ্বের শিক্ষানুরাগীদের। ধর্মশিক্ষাকে যুগোপযোগী করা হলে তা কিভাবে উগ্রবাদের প্রতিষেধক হতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে তুরস্কের হাতেপ স্কুলগুলো। পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মাদরাসা পড়ুয়া তরুণদের ভেতর জন্ম নেয়া উগ্রবাদের সামনে যখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রায় নতজানু, তখন এই সব দেশের শিক্ষা প্রতিনিধিরা তুরস্ক সফর করে অনুরূপ প্রতিষ্ঠান গঠনের জন্য সরকারের সাহায্য চেয়েছেন। এছাড়া রাশিয়া, বেলজিয়াম সহ বিভিন্ন ইউরোপিয়ান দেশ তাদের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য হাতেপ স্কুল প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখিয়েছেন। উৎসাহী পাঠক ইমাম হাতেপ স্কুল লিখে গুগলে সার্চ দিলেই দেখতে পাবেন কট্টর জায়নবাদী পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম থেকে শুরু করে উদারপন্থী মুসলিম, এমনকি রক্ষণশীল নেতারাও কিভাবে একবাক্যে কবুল করছেন হাতেপ স্কুলগুলোর অসামান্য সাফল্যের কথা।

এই প্রতিষ্ঠানের আর একটি চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্মীয় ভাতৃত্বের সমন্বয়। কিভাবে তুরস্কের মতো একটি রীতিমত ইসলাম বিদ্বেষী রাষ্ট্রে ইসলামপন্থী একেপি পার্টি পর পর তিন বার জয় লাভ করে তার কারণ খুঁজতে গেলেও আমাদের তাকাতে হবে এই হাতেপ স্কুলের দেয়াল গুলোতে। যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা) এর নৈতিকতা বিষয়ক বিভিন্ন হাদিসের পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে তরুণদের উদ্দেশ্যে প্রদান করা বিপ্লবী নেতা মুসতাফা কেমাল পাশার বিভিন্ন বানী। আমাদের দেশের মাদরাসাগুলো যেখানে জাতীয় সঙ্গীত আর জাতীয় পতাকা তোলার প্রশ্নে নীরব, ধর্মীয় বিদ্যালয়ে দুনিয়াবি শিক্ষা আদৌ গ্রহণ করা যাবে কি না তা নিয়ে আলেমদের ভেতর যখন অন্তহীন বিবাদ চলছে, সেখানে সেই তিরিশের দশকে তুর্কীরা ইসলামের ভয়াবহ প্রতিকূল সরকারের কাছে থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে পেরেছে।

রিসেপ তাইয়্যেব এরদুগান, হাতেপ স্কুলের একজন সাবেক ছাত্র

সেই হাতেপ স্কুলের সাবেক একজন ছাত্রই নেতৃত্ব দিচ্ছেন আজকের তুরস্ককে, আমি রিসেপ তাইয়্যেব এরদুগানের কথা বলছি। প্রত্যেকবার আগের চাইতে দ্বিগুণ ভোটে পরপর তিনবার নির্বাচিত এই সফল রাষ্ট্রনায়ক নতুন একটি সংবিধান গঠন করে তুরস্ককে মুসলিম বিশ্বের রোল মডেলে পরিণত করে ফেলার আগেই, আমার মনে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s