মাঝরাতের সৈকত আর আমাদের ব্যর্থ হয়ে যাওয়া চন্দ্রগ্রহণ অভিযান

উমর

আজকের পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করতে আমরা কজন মিলে সৈকতে কাটিয়ে আসলাম অসাধারণ কিছু মুহূর্ত। রুমে ফিরে আসার পর বারবারই মনে হচ্ছে এরকম স্মরণীয় একটি রাত নিয়ে কিছু একটা লেখা উচিত।  সৈকতে জোয়ারের পানির সো সো শব্দের ভেতর পাথরের উপর বসে গ্রহণ দেখলে কেমন হয়! পত্রিকায় গ্রহণের খবর দেখার পরই প্ল্যানটা মাথায় এসেছিলো আমার। যেই ভাবা সেই কাজ, রাত সাড়ে এগারোটায় হলের গেট বন্ধ হওয়ার কিছু আগে মোটমাট বারো জন বের হয়ে আসলাম আমরা, গন্তব্য কুমিরা বিচ।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ক্যামেরা ম্যানেজ করা হয়েছে, সেটা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে আমরা এগিয়ে চলছি। সাথে কোরাসে গান চলছে, “এই বৃষ্টি-ভেজা রাতে তুমি নেই বলে…সময় আমার কাটে না, মেঘ কেন আলো দেয় না…তারা কেন পথ দেখায় না…তুমি কেন কাছে আসো না…” সবকিছুই ঠিক আছে। কিন্তু যার জন্যে এতো আয়োজন, সেই চাঁদ হঠাত করেই কালো মেঘে ঢেকে গেলো। বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে, তাড়াহুড়া করে কতগুলি গ্রুপ ছবি নিয়ে আমরা পা চালাতে লাগলাম। সৈকতে ছোট ছোট ঘর পাওয়া যাবে ছাউনি হিসেবে, কিন্তু পথে বৃষ্টির মুখে পড়লে কাক ভেজা হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

কুমিরা বিচ আসলে তেমন দর্শনীয় কোনও জায়গা না, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে হওয়ায় আমরা মাঝে মাঝে লোনা পানির টানে সময় কাটাতে আসি। শুনেছি জাহাজ কাটা শিল্প হওয়ার আগে নাকি এখানকার পরিবেশ অনেক মনোরম ছিলো, নির্জন বালুতটে সশব্দে আছড়ে পড়তো জোয়ারের প্রবল ঢেউ। এখনো জোয়ারের সময় সেরকম প্রবল ঢেউ ওঠে, কিন্তু গাছ কেটে ফেলায় প্রকৃতি সবুজ হারিয়েছে বহুদিন আগেই। সৈকতের সামনের বাধ পেরোতে গিয়ে দেখি নিচের অংশে জোয়ারের পানি ঢুকতে শুরু করেছে, পাশে কতগুলো নৌকাও বাধা ছিলো। নৌকার সাথে ছবি তুলতে গিয়ে মাসুদ হাস্যকর ভাবে পিছলে পড়ে গেলো, হাসার ঘটনা না হলেও হাসলাম। যাক এতদিনে পেশী ফুলানো সার্থক হলো! ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে নির্ঘাত হাত বা পা কোথাও না কোথাও ভাঙ্গতো।

বাঁধের নিচে সার করে বাধা নৌকা

কাদাপানির মাঝে মাঝে রাখা পাথরের উপ পা দিয়ে দিয়ে বাধের উপর উঠে দাড়াতেই দেখলাম সমুদ্রের চিরচারিত রুদ্র মূর্তি, ভয়াবহ ভাবে ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাড়ের দিকে। প্রতিবারের আঘাতে কেপে কেপে উঠছে সার করে বাধা নৌকাগুলো। একটা নৌকার ভেতর বসে আমরা বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম, নৌকার মাঝিরা খোলা আকাশের নিচে চাদর পেতে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। রাজনের মাথায় এমনিতেই ছবি তোলার নেশা, তার উপর এমন দুর্লভ মুহূর্ত, একজন মাঝির ছবি তুলতে গিয়ে তাকে বেশ বিরক্তই করে ফেললো সে। মাহবুব আবার আরেক ধান্দাবাজ, সে সোজা গিয়ে মাঝির পাশে শুয়ে পড়ে সহোদর ভাইয়ের মত একটা ছবি তুলিয়ে নিলো এই চান্সে। আমি ব্রিজের একটা পাটাতনে বসে সাগর দেখছিলাম, দূরে জাহাজ ভিড়ে আছে, বাতাসের তীব্র সুরে মাতাল হয়ে তীরে আছড়ে পড়ছে সহস্র ঢেউ। আফসোস লাগছে, ইশশ…আকাশে যদি মেঘ না থাকতো!

নৌকার ভেতর ঘুমন্ত মাঝি, সাথে মাহবুব

চন্দ্রগ্রহণ দেখা হবে না নিশ্চিত জানার পরও আমাদের ভেতর কিন্তু আগ্রহের বিন্দুমাত্র কমতি ছিলো না। ভেজা পাথরের উপর পা দিয়ে ঠিকই পৌঁছে গেছি সাগরের খুব কাছে, ঢেউয়ের প্রবল ঝাপটায় কিছুক্ষণ পর পরই ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ চিৎকার ও করে উঠছে। ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস যেন স্পর্শ করছে আমাদের সত্তা, ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের হৃদয়ের প্রতিটি অলিন্দ দুয়ার। বেশ কয়েকজন তো একেবারে ভিজেই গেলো আচমকা আসা ঢেউয়ের সামনে পড়ে।

ওদেরকে রেখে আমি সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে গেলাম। পা দিয়ে ধীরে ধীরে যেন দুই ভাগ করে দিচ্ছি বালি থেকে সমুদ্রকে। আকাশের দিকে তাকালাম, ছেড়া ছেড়া মেঘ সারা আকাশে। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি চিক চিক করছে, আর গর্জনরত সাগরের মাঝে অসহায় এক মানব সন্তান অজানা উদ্দেশ্য নিয়ে হেটে চলছি এক জীবনের পথ। চোখ বুজে আরাধ্য দেবীর কাছে পৌছাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঝাপসা হয়ে যাওয়া সেই প্রতিবিম্ব থেকে অনেক দূরেই চলে এসেছি যেন আমি। জীবনের অসারতার সামনে ম্লান হয়ে গেছে সহস্র রজনীর প্রার্থনা। পিছনের কোলাহলের শব্দে সম্বিত ফিরে পেয়ে পিছু হেটে আবার চলে আসলাম চেনা জগতে।

ক্যামেরা নিয়ে সুফিয়ান আর রাজন বেশ ভালোই জমাচ্ছে, কিছুক্ষণ পর পর ঝলসে উঠছে ফ্লাশের তীব্র আলো, আর শুট হচ্ছে একেকটা করে ইমোশন দেখানো ছবি। সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচিও হচ্ছে তুমুল। একপর্যায়ে ইয়ার্ডের বেশ কিছু সিকিউরিটি এসে আর যা-ই করি অন্তত চিৎকার না দেয়ার জন্য অনুরোধ করে গেলো। তাদের ভয়, এভাবে চিৎকার চলতে থাকলে ডাকাতি হচ্ছে ভেবে আশেপাশের লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে চলে আসতে পারে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! জোয়ারের টান ততক্ষণে রক্তে পৌঁছে গেছে আমাদের।

এভাবে অনেকক্ষন হাসি আড্ডায় সময় কাটানোর পর আমাদের মনে হলো অনেক হয়েছে, এখন ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু বাধের দুইপাশেই তো পানি! আর পানির নিচের মাটি এতোই পিচ্ছিল যে পা রাখাই কষ্ট। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানলাম আরেকটি ব্রিজ আছে যেটা দিয়ে হাঁটাপথেই রাস্তায় উঠা সম্ভব, কিন্তু ব্রিজের কোনও পাটাতন নেই। আফসার এর আগে একবার এই পথে এসেছে, সে বললো এই ব্রিজে উঠার চেয়ে হাটুপানি পার হওয়াই বেশী নিরাপদ। আমি বললাম, “চলো আগে দেখে আসি কি অবস্থা সেই ব্রিজের, তারপর নাহয় ফিরে আসা যাবে..”

অনেক পুরাতন লোহার একটা ব্রিজ। ব্রিজ না বলে জংধরা লোহার কংকাল বললেই ভালো হয়। একটা পাটাতনও নেই, নিচে সাগরের সাথে সংযুক্ত একটা খাল, রীতিমতো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত দুইটার সময় এটা পার হতে হবে আমাদের। অনেক গাইগুই সত্ত্বেও একে একে ব্রিজের রেলিং এর উপর হাত, আর নিচের ফ্রেমের উপর পা দিয়ে এগুতে লাগলাম। স্বীকার করতেই হবে, বেশ ভয় লাগছিলো। এই অবস্থায় রাজনের খায়েশ হলো আমাদের ছবি তুলবে। ক্যামেরা আমার পকেটে ছিলো, আর আমি তখন হিমশিম খাচ্ছি ভারসাম্য বজায় রাখতে। সোজা বলে দিলাম, এখন ক্যামেরা বের করা সম্ভব না। ওদিকে আমার পিছনে থাকা মেহেদি মাঝপথে আবিষ্কার করলো তার গার্লফ্রেন্ডের ফোন ওয়েটিং, আর যায় কোথায়! পারলে এখনি ঝাপ দিয়ে পানিতে পড়ে জীবন শেষ করে ফেলে…কিছু কিছু মানুষের মধ্যে সিরিয়াসনেস যে এতো কম!

শেষ পর্যন্ত সবাই ব্রিজ পার হওয়ার পর আমরা লোকালয়ের ভেতর এসে পৌঁছলাম। জিয়া, মাসুদ আর মিজান মিলে শুরু করলো মাতলামির অভিনয়। বাধা না দিয়ে ওদেরকে বললাম বেশি চিল্লাচিল্লি না করতে। লোকজন বের হয়ে আসলে ঝামেলা হয়ে যাবে। দেখা যাবে সবাই পালিয়েছে, আর আমি একা ওদের হাতে ধরা পড়ে গেছি। এই নিয়ে কিছুটা হাসি তামাশাও হলো। যাই হোক চন্দ্রগ্রহণ-টা আর দেখা হলো না আমাদের, মেঘ তখনো অনেক গাঢ়। তবে একপাশের আকাশ কালো হয়ে যাওয়ায় আফসার বললো, গ্রহণ মনে হয় শুরু হচ্ছে।

ততক্ষণে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পৌঁছে গেছি, আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। চাঁদ একেবারেই দেখা যাচ্ছে না, আকাশ জুড়ে যেন অমাবস্যার অন্ধকার। জানি এই অন্ধকার কিছুক্ষণ পরই মিলিয়ে যাবে, আর গ্রহণের শেষ দাগ মুছে দিয়ে আবার জোছনার কাব্যিক আলো আধারে ভেসে যাবে এই রাত।

জোছনার বনে আগুন লেগেছে যেন,
গ্রহণের রাত্রি শেষে~
আমার মনের গ্রহণ কাটবে কতদিনে,
ভাবছি অবকাশে;

আবার কবে চন্দ্রগ্রহণ হবে কে জানে! আর কি এরকম সুযোগ হবে..? প্রথমবারের মতো গ্রহণ দেখতে না পারার জন্য আফসোস হচ্ছে। “এবার দেখা হলো না তাতে কি, পরেরবার ঠিকই হবে। “ সৈকতে তোলা ছবিগুলো দেখতে দেখতে মনে মনে নিজেই নিজেকে স্বান্তনা দিলাম এই বলে।

Advertisements

2 comments

  1. হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক; কুমিরা বিচ আগে অনেক সুন্দর ছিল। গাছ-পালায় বিচের পরিবেশটা দারুণ ছিল। কিন্তু জাহাজ কাটা শিল্প উক্ত এলাকায় বিস্তার করায় এখন আর কুমিরা বিচের সেই সৌন্দর্য নেই।

    রমজান মাসে সারাটা রাত আমরা কুমিরা বিচে কাটাতাম। তারাবির নামাজ প…ড়ে হালকা খাবার খেয়ে রাত ১০:৩০-এর দিকে ১০/১২ জন বন্ধু মিলে চলে যেতাম বিচে। হলে ফিরতাম সেহেরীর সময়। অনেক আনন্দঘন মূহুর্ত ছিল সেই সময়গুলো। এখন মিস করি হলের সেই আবেগঘণ সময়ের কথা।

    যাহোক, অনেক সুন্দর লিখেছ তুমি। ভাল থেকো।

    • ভালো একটা বুদ্ধি দিসেন, হরতালের ঠেলায় পরীক্ষা যদি পিছায় যায় তাইলে রোজার সময় এরকম করবো 🙂 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s