কে কবি, কবে কে মোরে

উমর

কবিতা নিয়ে মিজান ভাইয়ের সাথে মাঝে মাঝেই রুমে বসে আড্ডা দিতাম আগে। মিজান ভাই মানে আরেফিন রুমীর ‘তুমি যদি চাও’ গানের লিরিসিস্ট। আমাদের ক্যাম্পাসে আবার সাহিত্যচর্চার পরিবেশ একেবারে নেই বললেই চলে। সৃষ্টিশীল কাজের দিকে ঝোঁক আছে এমন মানুষ কম, প্রায় সকলেই দর্শকশ্রোতা। তাই পরিচিত হওয়ার পরপরই লিরিক নিয়ে রাত বিরাতে অপারেশনে বসে যেতাম দুইজন। সে সময় তিনি নিজের লেখাগুলো নিয়ে সিরিয়াসলি কিছু একটা করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছেন, আর আমিও সব ছেড়েছুড়ে সাহিত্যের মাঝে মাত্র ডুব দিয়েছি।

তো একদিন কথায় কথায় বলছিলেন নিজের প্রথম কবিতা লেখার গল্প। সেটা এরকম, ক্লাশের বাংলার টিচার সবাইকে দুই লাইনের কবিতা লিখতে বলেছেন। কিন্তু কারোটাই তেমন পছন্দ হচ্ছে না স্যারের, এক পর্যায়ে মিজান ভাই যখন নিজের কবিতাটা পড়লেন স্যার অবাক হয়ে বললেন, আবার পড়। মিজান ভাই আবার পড়লেন। স্যার বললেন আরেকবার পড়তে। এভাবে সাত আট বার পড়ার পর স্যার ক্ষান্ত দিয়ে বলেছিলেন, অসাধারণ!

স্যারের এই আচরণই নাকি তাকে কবিতা লেখার প্রেরণা যুগিয়েছে পরবর্তীকালে। সাধারণ কতগুলো কথার মাঝে মানুষ কিভাবে অসাধারণত্ব খুঁজে পায়, তা জেনে ফেলার পর আর কখনোই লেখালিখি থামিয়ে রাখেননি তিনি। এই নিরন্তর প্রচেষ্টার ফলেই আজ লিরিসিস্ট হিসেবে নিজের অভিষেকের দিন গুনছেন এই নবীন কবি।

মিজান ভাইয়ের গল্পটা শুনে আমার নিজের কবিতা লেখার কাহিনী মনে পড়ে গেলো। এটা সম্ভবত ৯৬ কি ৯৭ সালের কথা, আমরা তখন লক্ষ্মীপুরে থাকি। আমি তখন একেবারেই পিচ্চি, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাই, বাড়ির পাশের একটা কিন্ডারগার্ডেনে পড়ি। শুরুটা হয়েছিলো একটি পত্রিকার কবিতা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। পত্রিকায় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ঐ কবিতা প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন দেখে মুখে মুখে মিলিয়ে দেয়া কিছু লাইন লিখে পাঠিয়ে ছিলাম তাদের ঠিকানায়, আর ছাপাও হয়েছিলো সেটা। বাবার উৎসাহের আতিশয্যে সেটা পরে আরও বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিলো। কিন্তু এটা কি আসলেই সেরকম অর্থে ভালো কবিতা হয়েছিলো? মনে হয় না, কারণ পরে লাইন গুলো আমি নিজেই কিছুটা পরিবর্তন করে দিয়েছি। পাঠক বিবেচনা করুন,

মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা,
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা;
শেখ মুজিবের অনল ভাষণ-
দেশ স্বাধীনের অনড় স্বপন;
যুদ্ধশেষে ফিরলো ঘরে সবাই,
তাদের মতো ভালো, কাজ কেউ করেনি ভাই;
মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা,
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা

এর পর এক কবিতার কবি হিসেবেই কাটিয়ে দিয়েছি বাকী স্কুলজীবন। কোনও ছন্দ মনের মাঝে শব্দ শব্দ খেলেনি, আর বুকের ভেতর কবির সত্ত্বাটিও নীরবেই কাটিয়েছে সেই এক যুগের নির্বাসন। ক্লাস করার সময় লুকিয়ে কার্টুন আকার বাতিক ছিলো। একবার পরীক্ষার রুটিনের চারপাশে এত নিখুঁতভাবে কার্টুন এঁকে ভরে দিয়েছিলাম যে প্রথম দেখায় আমার মা বুঝতেই পারেননি এগুলো আমি কলম দিয়ে এঁকেছি, না রুটিনটাই এভাবে ছাপানো হয়েছে। তাই আমার খাতার মার্জিনে কার্টুন পাওয়া খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিলো সেসময়।

ক্লাশ নাইনে উঠার পর খাতার মার্জিনে কার্টুনের পাশাপাশি সেখানে দুই এক লাইনের কবিতা আবির্ভূত হতে শুরু করলো। এক সময় দেখা গেলো কার্টুন কমছে আর কবিতার আকার বাড়ছে। এভাবে অল্প অল্প করে লিখতে লিখতে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার ঠিক আগমুহূর্তে আমাকে প্রবলভাবে ধরলো কাব্যের জ্বর। কোনও ওষুধেই সেই জ্বর সারে না। লাল মলাটের ডাইরির পিছনের পাতাগুলোতে মিছিলের মতো একে একে জড়ো হতে লাগলো শব্দ শরীর। পড়ার টেবিলের গোপন ড্রয়ার খুলে ডাইরিতে যখন যা মাথায় আসে লিখি, আর কিছুক্ষণ পর পর সেগুলো পড়ে নিজেই অবাক হই। বাহ ভালোই তো লিখেছি! -নিজেকেই বলি।

মনে হয় এখনো, যেন এইতো সেদিন-
আমার মাঝেই আমি অন্তরীন;
সকালের শিশির ভেজা নরম ঘাসে-
তোমার ভালোবাসার সুরভী আসে..
জানালা খুলে দেখি সূর্য্য, প্রত্যহ আলোকিত-
তোমার কথা ভাবি আমি তার মাঝেও..
আকাশের দিকে যখনি তাকিয়ে দেখি-
রাতের তারার মাঝে খুঁজি তোমার ছবি;
জানালা খুলে দেখি সূর্য্য, প্রত্যহ আলোকিত-
তোমার কথা ভেবে চলি তার মাঝেও..

লেখালিখির শুরুটা করেছিলাম এভাবেই। যদিও এখন এটা মাঝে মাঝে ব্লগে পোস্ট আর ফেসবুকের স্ট্যাটাস আপডেটে দুই লাইনের কাব্যচর্চার মাঝেই সীমাবদ্ধ, তারপরও জীবনে প্রতিকূল সময়ে এর মাঝেই আশ্রয় খুঁজেছি সারা জীবন। আর এই সব সৃষ্টিশীল কাজের মাঝেই নিরন্তর খুঁজে চলি সেই পরম স্রষ্টাকে।

তবে একটা প্রশ্ন মনের ভেতর খুবই খচখচ করে, কবিতা লেখা যদি খুব স্বাভাবিক একটা অভ্যাস হয়, তাহলে সব কবিতার লেখক-ই কি কবি? তা তো না! সবাইকে তো কবি বলা হয় না, কিছু কিছু মানুষকে বলা হয়। তারা কেন কবি? অন্যরা কেন নয়? এই নিয়ে বহু আকাশ কুসুম চিন্তা ভাবনা করে হঠাত একদিন আবিষ্কার করলাম কবি নামের একটি সনেটের ভেতর এই প্রশ্নের সোজাসুজি একটা উত্তর দিয়েছেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এই লেখার সমাপ্তি সেই কবিতাটা দিয়েই টানছি।

কে কবি– কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,
শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,
সেই কি সে যম-দমী? তার শিরোপরি
শোভে কি অক্ষয় শোভা যশের রতন?
সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী
যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন,
অস্তগামী-ভানু-প্রভা-সদৃশ বিতরি
ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ-কিরণ।
আনন্দ, আক্ষেপ ক্রোধ, যার আজ্ঞা মানে
অরণ্যে কুসুম ফোটে যার ইচ্ছা-বলে;
নন্দন-কানন হতে যে সুজন আনে
পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে;
মরুভূমে– তুষ্ট হয়ে যাহার ধেয়ানে
বহে জলবতী নদী মৃদু কলকলে!

অফটপিক: কিছুদিন আগে কবিতা নিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠের এক বড় ভাইয়ের সাথে আলাপ হচ্ছিল। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন তার পত্রিকার শিলালিপি পাতাতে শুধু নির্বাচিত কবি সাহিত্যিকদের রচনাই ছাপা হয়। শুনে হতাশ হলাম, কারণ একটা বড় পত্রিকার সাহিত্য-পাতার মান উন্নত করতে সেখানে প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম বেশী প্রকাশ পাবে সেটা ঠিক আছে, কিন্তু তারপরও নবীনদের জন্য ন্যুন্যতম একটা কোটা থাকা উচিত। আমাদের সাহিত্যের যত সমৃদ্ধ ইতিহাসই থাক, নবীনদেরকে সামনে এগিয়ে দিয়ে সেই গতিধারা যদি অক্ষুণ্ণ রাখা না হয় তাহলে সেই ইতিহাস ঐতিহ্য আমাদের শুধু স্মৃতিকাতর-ই করবে, নতুন কিছু সৃষ্টিতে সহায়তা করবে না।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s