ছবি তোলার পেছনের কাহিনী

উমর

সারা দিন পড়ে পড়ে ঘুমানো অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, ভোর রাত না হলে ল্যাপটপের ডালা নামানোই হয় না। তাই উঠতে উঠতেও এগারোটা বারোটা স্বাভাবিকভাবেই বেজে যায়। এরকমই একটা দিনে কড়া রোদের ভেতর সকালের হালকা নাস্তা করে ক্যান্টিন থেকে বের হয়েছি, পথে বিবিএ ডিপার্টমেন্টের পিছনের রাস্তায় ঢুকতেই দেখি মাহবুব আর রাজন হাটতে হাটতে একবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে আবার একটু পর মাটির মধ্যে কি যেন খুজছে, স্বাভাবিক ভাবেই কৌতুহল জাগলো মনে। কাছে গিয়ে জানতে পারলাম রাজন ঝিঝি পোকার ছবি তুলতে চায়, আর মাহবুব তাকে সাহায্য করছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, গাছের মাথায় উঠে ঝিঝি পোকার ছবি তোলা তো আর সম্ভব না, আবার নিচে যে পোকা গুলো আছে সেগুলো ঘাসের ভেতর থাকায় বাতাসের কারনে কিছুতেই তাদের ফোকাস করা যাচ্ছে না।

ঘাসের উপর ঝিঝি পোকা

রাজন তার একাগ্রচিত্তে মাটিতে বসে একের পর এক স্নাপ নিচ্ছে কিন্তু একটা ছবিও স্পষ্ট আসছে না।

নাহ কিছুতেই পোকাটাকে ফোকাস করা যাচ্ছে না...

 

 

 

 

 

 

 

শেষমেষ আমিও ওর সাথে বসে পড়লাম, ঘাসের আগা আঙ্গুল দিয়ে ধরে বাতাস আটকানো হলো, কিন্তু এত ছোট অবজেক্ট সনি এরিকসন মোবাইলের ক্যামেরাটা কিছুতেই ফোকাস করতে পারছিলো না। কি আর করা !

ঘাসের ডগা ধরে বাতাস আটকানোর চেষ্টা, কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না...

 

মাহবুব উঠে পড়লো, সে তার এন সিরিজের নোকিয়া নিয়ে আমাদের বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছে যেগুলা এখানে দেখছেন। আমরা যতক্ষনে ঝিঝি পোকা নিয়ে ব্যস্ত, সে কি মনে করে পাশে দাঁড়ানো উতসুক কুকুরের মুখ হা করা একটা বিভতস ছবি তুলে বসলো,

ছবি তোলার সময় কিভাবে মাহবুব কুকুরটাকে হা করিয়েছে আল্লাহই জানে...

আমরা সেই ছবি নিয়ে হাসাহাসি করতে করতে হলে চলে আসলাম। রাজনের ক্যামেরা থেকে ব্যর্থ সেই প্রচেষ্টার কিছু নমুনা দেখুন:

 

 

 

মিনিট বিশেক পর রাজন রুমে এসে হাজির। সে নাকি পোকাটার অদ্ভূত কিছু স্নাপ নিয়ে ফেলেছে। আমি নিজেও দেখে অবাক, কিভাবে সম্ভব ! এ তো ঝিঝি পোকার পুরা কালেকশন ! একটাতে লাল চোখ নিয়ে লেন্সের দিকে তাকিয়ে আছে,আরেকটাতে ভাঙ্গা পাখা নিয়ে একটা পোকা ডালে ঝুলে আছে। এমনকী ঝিঝি পোকার খোলস থেকে বের হওয়ার দৃশ্য পর্যন্ত ফ্রেমবন্দী করে ফেলেছে সে। সৃষ্টিশীল মানুষের একাগ্রতা আসলে এমন একটা শক্তি যেটা চাইলে আবর্জনার স্তুপ থেকে হীরক খন্ড বের করে আনতে পারে।

সেশনের সমস্ত ছবি দেখতে ঘুরে আসুন রাজনের ছবি ব্লগ থেকে।

আমি দেখতে দেখতে অবাক হয়ে ভাবছিলাম ছবিগুলো পাওয়ার পর কত আগ্রহ নিয়ে ঝিঝি পোকা দেখছি, কিন্তু প্রকৃতির মাঝে এরা আমার নজর কাড়তে পারলো না কেন?

পরে ভেবে দেখলাম আসলে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য আমাদের চোখে সয়ে গেছে বলেই এরকমটা হয়। আর সচরাচর দেখা অবজেক্টগুলোকে সাবজেক্ট বানিয়ে আমাদের চমকে দেয়ার মাঝেই তো প্রকৃত ফটোগ্রাফারের স্বার্থকতা। পত্রিকার ফটো সাংবাদিকদের ছবি হাজার কপি ছাপা হয় কিন্তু পরের দিন তার একটিরও খবর কেউ কি রাখে ? কিন্তু অখ্যাত একজন ফ্রীল্যান্স ফটোগ্রাফারের একটা মাত্র ছবিই অবলীলায় স্থান করে নেয় শিল্পের কাতারে, মানুষের হৃদয়ে। জীবনে কখনো ফটো একজিবিশনে যাওয়ার আগ্রহ হয়নি আমার, তবে একটি ছবি তোলার পেছনের এই গল্পটা আমাকে ফটোগ্রাফী নিয়ে বেশ আগ্রহী করে তুলেছে।

Advertisements

8 comments

  1. 🙂 সচরাচর দেখা অবজেক্টগুলোকে সাবজেক্ট বানিয়ে আমাদের চমকে দেয়ার মাঝেই তো প্রকৃত ফটোগ্রাফারের স্বার্থকতা। পত্রিকার ফটো সাংবাদিকদের ছবি হাজার কপি ছাপা হয় কিন্তু পরের দিন তার একটিরও খবর কেউ কি রাখে ? কিন্তু অখ্যাত একজন ফ্রীল্যান্স ফটোগ্রাফারের একটা মাত্র ছবিই অবলীলায় স্থান করে নেয় শিল্পের কাতারে, মানুষের হৃদয়ে।

  2. সত্য কথা @Homayra
    “সচরাচর দেখা অবজেক্টগুলোকে সাবজেক্ট বানিয়ে আমাদের চমকে দেয়ার মাঝেই তো প্রকৃত ফটোগ্রাফারের স্বার্থকতা। পত্রিকার ফটো সাংবাদিকদের ছবি হাজার কপি ছাপা হয় কিন্তু পরের দিন তার একটিরও খবর কেউ কি রাখে ? কিন্তু অখ্যাত একজন ফ্রীল্যান্স ফটোগ্রাফারের একটা মাত্র ছবিই অবলীলায় স্থান করে নেয় শিল্পের কাতারে, মানুষের হৃদয়ে।”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s