বাবার কাছে ছোটবেলায় করা আমার একটি প্রশ্ন আর বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা

উমর

“আচ্ছা, যদি দেশে মামলা আর না হয় তাহলে বিচারকদের কি হবে?” ছোটবেলায় এই প্রশ্নটা প্রায়ই করতাম বাবাকে, বাবা বেশীরভাগ সময়ই বলতেন, “কেন মামলা হবে না? একটা সমাজের ভেতর নানা রকম সমস্যা হতে পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর সেই বিরোধ-বিভেদের মীমাংসা করাই বিচারকের কাজ। তাই সমাজ বা সভ্যতা যতদিন আছে ততদিন আইন-আদালতের কাজও চলমান থাকবে।”

“কিন্তু যদি এরকম সময় আসে যে মামলা নিষ্পত্তি করার পর আর নতুন করে মামলা হচ্ছে না, তাহলে কি হবে?” আমার উৎকণ্ঠাকে একটু বাড়িয়ে বাবা হেসে বলতেন “তাহলে কোর্ট-কাচারি বন্ধ হয়ে যাবে, বিচার কাজ আর করতে হবে না আমাদের!” এই কথা শুনলেই আতংকিত হয়ে পড়তাম আমি, আমাদের তখন কি হবে? বাবা তখন কি নতুন আর একটা চাকরী খুঁজে পাবে এরকম? আমি ঠিক জানি না আমার এই আশংকার কথা বাবা টের পেতেন কি না, তবে আমি এইরকম একটা দুশ্চিন্তায় যে ভুগতাম তা আমার স্পষ্ট মনে আছে।

এরপর আমি বড় হয়েছি, অন্তত এইটুকু বোঝার মতো বয়স হয়েছে যে নিকট বা দূর কোনও ভবিষ্যতেই কোর্ট কাচারি বন্ধ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। বরং দিন দিন যেভাবে মামলাজট আর বাঙ্গালীর হাইকোর্ট দেখানো বাড়ছে সামনে হয়তো কোর্টের বারান্দায় পায়চারী করেই মানুষকে পার করতে হবে জীবনের অনেকটা সময়। আইনের ছাত্র হিসেবে বিভিন্ন সময়ের লিগ্যাল হিস্ট্রি পড়তে হয়েছে, প্রাচীন রোমান ও হিন্দু সভ্যতা,আরবদের মধ্যযুগ বা পরবর্তীতে ইংরেজদের উপনিবেশ, আর সবশেষে মার্ক্সবাদ আর পুঁজিবাদের লড়াই সব জায়গাই ঘুরে দেখেছি, কেমন ছিলো তাদের সমাজ আর আইনের ক্রমবিকাশের চিত্র। এখন বুঝি কেন বাবা হাসতেন আমার বোকা বোকা কথা শুনে, এরকম ইউটোপিয়া সমাজ আসলে বইয়ের পাতায় পাওয়া যায়, বাস্তবে না।

সবসময়ই ইসলামের সোনালী যুগের কথা শুনে এসেছি লোকমুখে, তারপরও ইসলামের ইতিহাস পড়তে গিয়ে কিছুটা হোঁচট খেতেই হয়, ইসলামের প্রথম খলীফা হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর হযরত আবু বকর রা. প্রধান বিচারক হিসেবে কাকে নিয়োগ করা যায় এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। অনেক চিন্তা ভাবনার পর তিনি হযরত উমর রা. কে উক্ত পদে আসীন করেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে এক বছরের পার হওয়ার আগেই উমর রা ঐ পদ হতে অব্যাহতি গ্রহণ করেন ! প্রশ্ন জাগে, কেন? কি এমন ঘটলো যে উমর রা. এর মতো কঠিন ব্যক্তি এই পদে থাকতে পারলেন না? বলছি, তার আগে এক নজর দেখে আসি আমাদের দেশের বিচারালয়ের অবস্থা।

আমাদের দেশে নিম্ন আর উচ্চ আদালত মিলিয়ে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক মামলা ফি বছর অমীমাংসিত থাকে। এর মধ্যে অর্ধেকই জমি জমা বিষয়ক মামলা। এগুলো নিষ্পত্তি হয় ১০-১৫ বছরে, আর অনেক সময় এরকম হয় যে দাদার মামলার জন্য নাতীকে ছুটতে হচ্ছে। আমার এক বন্ধুকে জানি তাকে জমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য দাদার দায়ের করা মামলা সামাল দিতে হয়। ঐ বন্ধুর বাবা এই মামলার কারণে বাড়ী পর্যন্ত করতে পারেননি নিজের জমির উপর। আরেক বন্ধু আছে যার চাচাকে খুন করে হয়েছে তার মায়ের সামনে। মা দেখেছেন কিভাবে তার ছেলেকে কোপানো হয়েছে, সেই বর্ণনা আদালতে দেয়ার পর রায় এসেছে এটা আসলে খুন নয়, অন্ধকার রাস্তায় দুর্ঘটনার কারণে সম্ভবত বাস বা ট্রাকের চাপায় লোকটি নিহত হয়েছে। সেই বন্ধু যখন মন খারাপ করে এই রায়ের কথা আমাকে বলেছিলও তখন মনে হচ্ছিলো একটা দা নিয়ে ঐ বিচারক কে কোপায় আসি।

পাকিস্তানের সোয়াত ভ্যালীতে শরীয়া আইন বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিলো তখন বিবিসির টেলপ নিউজে দেখানো বার্তাটি ছিলো এমন, “Sharia Court ensures speedy trial”। অনেকেই জানেন না যে সোয়াত ভ্যালীর এই আন্দোলনটা প্রথমে কিন্তু তালেবানদের হাতে ছিলো না। এটা সাধারণ মানুষেরই দাবী ছিলো প্রথমে, পরে মিডিয়ার প্রশ্রয়ে তালেবানরা একে কব্জা করে। আসলে শরীয়া কোর্ট বলতে তারা যা বুঝিয়েছিলও সেটা হলো মসজিদের বারান্দায় গ্রামের মোড়লদের সালিশকে। কারণ এখানকার কোর্টকাছারি গুলো কার্যত অচল, দুর্গম এই অঞ্চলে বাইরে থেকে কোট-স্যুট পরা বিচারক, জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রিতায় ভরা আদালতে মানুষ ন্যায় বিচার পাওয়ার আশাই করতো না। তাই একসময় তারা নিজেদের মতো করে গড়ে তুললো পৃথক বিচার ব্যবস্থা।পরবর্তীতে তালেবানদের প্রভাবে এখানে কট্টরপন্থীদের আধিপত্য কায়েম হয়েছে। তবে তার আগে সালিসি পদ্ধতিতে বিচারের প্রতিষ্ঠানকে তারা যে অনেকটা গণমুখী করে তুলতে পেরেছিল তা সত্য। আমরা দ্রুত বিচার পাওয়ার জন্য হয়তো এরকম সেকেলে পদ্ধতিতে ফিরে যাবো না, কিন্তু দাপ্তরিক জটিলতা গুলোকে দূর করার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সহজেই যাতে আইন আদালত না বোঝা মানুষও সহজে ন্যায়বিচার পেয়ে ফিরে আসতে পারে।

আদালতের মামলা সংখ্যা শূন্য হয়তো এই আধুনিক পৃথিবীতে হওয়া সম্ভব নয় কিন্তু মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়ালে বিচার প্রার্থীর ভোগান্তি কমানো অনেকটাই সহজ হবে। এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যা যা করার তা করতে হবে, কিন্তু ন্যায় বিচার তখনই নিশ্চিত হবে যখন আমরা প্রতিটি বিচারালয়ে ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক নিয়োগ নিশ্চিত করতে পারবো। বিচারক নিয়োগ নিয়ে প্রথমে হেয়ালী করে যে গল্পটি বলা শুরু করেছিলাম সেটা শেষ করে লেখার ইতি টানছি। প্রায় এক বছর ধরে বিচারক পদে আসীন থাকার পরও যখন হযরত উমর রা. দেখলেন কেউ তার কাছে কোনও মামলা নিয়ে আসছে না তখন তিনি খলীফাকে সবিশেষ অবহিত করে তাকে বিচারকার্য থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রয়োজনে অন্যত্র অন্য কোনও দায়িত্ব দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

Advertisements

5 comments

  1. আপনার লেখাটি আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। আমি নিজেও একজন আইনের ছাত্র হওয়াতে ব্যাপারগুলো খুব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছি। অনেক ধন্যবাদ সুন্দর একটি লেখা উপহার দেবার জন্যে। আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেসটা যদি আমাকে দিতেন, তাহলে আপনার সাথে যোগাযোগ করতাম। আশা করি নিরাশ করবেন না। আমার এ্যাড্রেস sarkermaruf@gmail.com

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s