আপন-পর এর সমীকরন

ইরতেজা ইরাদাত

বারেক সাহেব বাস-স্ট্যান্ড এর চেয়ারের উপর বসে আছেন। তার মনের ভিতর একটা প্রশ্ন এসেছে, তিনি ভাবছেন এতগুলো চেয়ার থাকতে তিনি এই ভাঙ্গা চেয়ারটাতে বসতে গেলেন কেন? হয়ত এর জন্য তিনি তার পোড়া কপাল টাকেই দোষারোপ করছেন। তিনি ভাবছেন দরজার পাশের যে চেয়ার তাতেও তিনি বসতে পারতেন। যেখানে এখন এক জন বেপারী বসে পান চিবাচ্ছে ! অথবা কাউন্টারের পাশে যেখানে আপাতত এক যুবক বসে আছে কানে মোবাইল গুজে…ছেলে টিকে দেখে তিনি আন্দাজ করতে পারছেন যুব সমাজ এর অবনতি কতখানি। তিনি ভাবলেন এরাই দেশটাকে নষ্ট করছে। আর নিজের ছেলের কথা মনে হতেই উচ্ছ্বসিত হলেন তিনি। এইতো সেদিন বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে এসেছে আনিস। পোশাক-আষাক, শিক্ষাগত যোগ্যতা..সবকিছুতেই একশ তে একশ! কিন্তু…..

“এই যে মুরুব্বি! বাস-এ উঠতেন না? ছাইরা দিল তো বাস!”- পত্রিকাটা হাতে দুলে দেশের যুব সমাজের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতে করতে বারেক সাহেব বাসে উঠলেন। উঠেই তার মেজাজ আরও বিগড়ে গেল আবার সেই ছেলেটাকে দেখে, যে মোবাইল কানে গুজে দাঁড়িয়ে ছিলো কাউন্টারে। এই মুহূর্তে ছেলেটি পাশের সিটের মেয়েটার দিকে তেলানো হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে। “এই যে ছেলে!” বারেক সাহেব বলে উঠলেন…”এটা আমার সিট…” “আংকেল, আপনি বরং আমার পাশের সিটটাতে বসুন..আর আমি এখানে বসি…ঠাণ্ডা বাতাস খেতে খেতে যাবেন…” বারেক সাহেব এর ইচ্ছা হলো চড় মেরে ছেলেটার দাঁত ফেলে দিতে। কিন্তু তিনি রাগ কমিয়ে পাশের সিটে বসলেন। তার কিছু আসে যায় না কোন সিটে তিনি বসছেন, এই শহর ছাড়তে পারলেই হলো।

“আজ-কাল কার ছেলে মেয়েরা…” বারেক সাহেব মনে মনে বললেন। তার মেয়ের রেহানার কথা ভাবলেন…অতি নম্র, বোকা-সোকা মেয়ে. অনেক আদরে বড় করেছেন, যোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দিয়েছেন। পিতা হিসেবে সব করেছেন। সেই ছোট রেহানা এখন সপরিবারে কানাডাতে আছে, বছরে এক বার করে আসে। প্রতিবার-ই বাবার জন্য কিছু না কিছু আনেই। গতবার এনেছিল একটা শাল। শালটা ছিল রেহানার শশুর এর ফেলে দেয়া শাল। রেহানা বলেনি, তবে বারেক সাহেব জানতে পেরেছিলেন। “বোকা মেয়ে”-বারেক সাহেব নিজেকে সান্ত্বনা দেন।

পাশের ছেলেটি আবার মোবাইলে কথা বলতে শুরু করেছে। ফাটা গলায় ছেড়ে যেন গান গাচ্ছে ছেলেটি, “আরেহ! মোবাইল কি গান শুনানোর জন্য নাকি?” বারেক সাহেব মনে মনে বলেন। এই মোবাইল জিনিসটার উপর খুবই বিরক্তি। কেন যে এটা মানুষ এর হাতে এলো! ভুলবশত আনিসের মোবাইলটা একদিন ভেঙ্গে ফেলতেই তো আনিস রেগে গিয়েছিল। বাবার যে এত দামী জিনিসে হাত দেয়ার দুই পয়সার যোগ্যতা নেই- তা অবলীলায় বলে ফেলেছিল আনিস! বারেক সাহেব কিছু বলেননি শুধু নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, যেই বাবা তার জন্য সবচে দামী ঘড়িটি কিনে দিয়েছিল, তাকে আনিস কি করে এমন কথা বলে? সাধ্যের বাইরে গিয়ে কাজ করেছিলেন বারেক সাহেব। পুত্র বধূ জেরিন এর বলা কথাটিও মনে আছে, “বুড়াটাকে ঘর থেক বের করে দেয়া উচিত!” বড় আদর করে বারেক সাহেব এর স্বর্গবাসী স্ত্রী মা মরা মেয়ে জেরিনকে ঘরে তুলেছিলেন। সে আজ থাকলে কি বলত?

“আঙ্কেল! জানালাটা একটু সরিয়ে দিন, বাতাস আসবে..আপনি আর আমি আরাম পাবো! তাই না?” বারেক সাহেব ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন ছেলেটার দিকে। জানালাটা সরিয়ে দিতেই তিনি শুনলেন ছেলেটি ফোনের ওপাশে কাউকে বলছে “তোমার কণ্ঠ ঠাণ্ডা বাতাসের মতই মধুর!” বারেক সাহেব ধরে নিলেন ছেলেটি যুব সমাজের অবনতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ছেলেটি মোবাইল রাখলে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেন। কিন্তু পরক্ষনেই যন্ত্রটা আবার বেজে উঠলো। এই বার ছেলে তা বলল, “সরি…আব্বা কল দিয়েছিল…” বারেক সাহেব আরও লক্ষ্য করলেন ছেলেটি ঠাণ্ডা বাতাস নিয়ে করা উক্তিটি পুনরাবৃত্তি করছে। বারেক সাহেব আর সহ্য করতে পারলেন না। চেঁচিয়ে হেল্পের কে ডাকলেন, “হেলপার…! এই যে হেলপার সাহেব…!! আমাকে অন্য কোথাও বসার জায়গা করে দাও…এখনি!”

বাসটা থামল আধা ঘন্টার জন্য। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে…অনেকেই জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে? বাস ড্রাইভারের কোনও কথা নেই, হেলপার সবাই কে সামলাতে ব্যস্ত। বারেক সাহেব দেখলেন ছেলেটি দুরে দাড়িয়ে, মোবাইলে কথা বলছে! ফোনটা রাখতেই বারেক সাহেব তার কাছে গেলেন, “তোমার নাম কি?” “জি..আমার নাম? আমার নাম শফিক” বারেক সাহেব তারপর চেঁচাতে আরম্ভ করলেন ,”তোমাদের মত বয়সে আমরা কাজ করে পরিবার চালিয়েছি..মেয়েদের সম্মান করেছি…দেশ কে ভালবাসতাম..তোমাদের অধঃপতন দেখলে বিস্মিত হই!”

আরও কিছুক্ষণ বলে গেলেন বারেক সাহেব,কিন্তু শফিক এর কোনও ভাবান্তর তিনি দেখলেন না…বরং তাকে মিটিমিটি হাসতে দেখে বারেক সাহেব হার মেনে নিয়ে বাস-এ উঠে বসলেন এবং দেশের অবনতির জন্য এদেরকেই দায়ী করলেন। এরপর বারেক সাহেব পত্রিকায় মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলেন, ঘুম দেয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু প্রতিবারই আনিস এর ব্যবহার, মেয়ের অবহেলা, পুত্রবধূর কটূক্তি তার মনে পড়ে গেল এবং তার মনটাকে বিষাক্ত করে গেল।

হঠাত বিকট শব্দে চোখ খুললে বারেক সাহেব দেখলেন তাদের বাসটি খাদে পড়ছে…শেষ মুহূর্তে নিজেকে রক্তে ভেজা লাল পাঞ্জাবি তে আবিষ্কার করলেন…সাথে সাথে ডান পায়ের ব্যথা পেয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন। এটাই শেষ ধরে নিয়ে শেষবারের মত পরিবার এর সদস্যকে মনে করে চোখ বুজলেন তিনি। তারপর আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান ফিরে আসার পর বারেক সাহেব নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক হাসপাতাল এর বেডে। তারপাশে শফিক বসে আছে, বারেক সাহেব এর হাতটি ধরে ! বেচারার মাথায় ব্যান্ডেজ….চোখের নিচ থেক গালের অনেকটা অংশ কাটা। “আপনার পায়ে কি ব্যথা আছে? লিগামেন্ট ড্যামেজ….রিকভার করতে দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। তারপর আপনি আবার দৌড়াতেও পারবেন” বলে হাসতে থাকলো শফিক। পরিচয়ের পর থেকে এই প্রথম বারেক সাহেব আবিষ্কার করলেন যে ছেলেটির হাসি খুব সুন্দর। “আমার ছেলেকে কি জানানো হয়েছে?”

শফিক এর হাসি চলে গেল নিমিষেই…বারেক সাহেব এর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলো শফিক। “আপনার পাঞ্জাবির পকেটে আপনার ছেলের নাম্বার আর বাসার ঠিকানা পেয়েছি কিন্তু আপনার ছেলে বলেছে সে আসতে পারবে না…” বারেক সাহেব অবাক হলেন, “তুমি কি কথা বলেছ?” “জি, আমি ফোন করলে আনিস নামক একজন ধরেন, এক্সিডেন্টের কথা বলাতে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন ..বুড়াটা কি বেচে আছে?”..বারেক সাহেব এর বুক থেকে এক দীর্ঘ নিশ্বাস বের হয়ে আসল। ঠাণ্ডা গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন…”তুমি কি বলেছ?” শফিক এবার বারেক সাহেব এর চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি বলেছি তিনি বেচে আছেন এবং থাকবেন। তারপর কল কেটে দিয়েছি”

শফিক লক্ষ্য করলো বারেক সাহেবের হাতটি অজান্তেই শফিকের মাথা স্পর্শ করেছে। কান্না জর্জরিত কণ্ঠে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন বুঝি বারেক সাহেব…..

Advertisements

6 comments

  1. আমাদের সামজ আজ বস্তুগত র্পথিবীর এত বেশী মোহে পরে গিয়েছে যে তারা ভুলেই যাচ্ছে তাদের জীবণের আসল উদ্দেশ্য কি ?
    কি এই ব্যর্থতা কার ?বারেক সাহেবের (কারণ তিনি ব্যর্থ তার পুত্রকে শিক্ষা দিতে পারেন নি জীবণ কি ?)
    নাকি এই সামাজের ?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s