বিচারকের বিদায় সম্মবর্ধনা

রোমেল রহমান

সরকারী চাকুরী মানেই বদলী-যোগ্য। কর্মকর্তা হলে তো কথাই নেই। নিয়ম অনুসারেই প্রতি তিন বৎসর অন্তর প্রায় সকল সরকারী কর্মকর্তাকেই বদলী হতে হয়। কোন কারণে এর ব্যত্যয় হলেও কর্মস্থলে চাকুরীর মেয়াদ তিন বৎসর হলেই বুঝতে হবে ঐ কর্মকর্তার বদলীর সময় হয়ে গেছে। কর্মস্থলে সরকারী কর্মকর্তাদের চাকুরীর মেয়াদের ক্ষেত্রে এভাবেই সীমা রেখা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে বয়স সংক্রান্ত বিষয়েও সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

১৯৭৪ সনের সরকারী কর্মচারী (অবসর গ্রহণ) আইন (১৯৭৪ সনের ১২ নং আইন ) এর ৪ ধারায় সরকারী কর্মচারীর অবসর গ্রহণের বয়স ৫৭ (সাতান্ন) বৎসর নির্ধারণ করা হয়েছে। শর্ত আরোপ করে বলা হয়েছে যে ২৫(পঁচিশ) বৎসর পর্যন্ত চাকুরী করার পর একজন সরকারী কর্মচারী স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তাকে অবসরে যাবার কাঙ্ক্ষিত তারিখের পূর্ববর্তী ৩০ (ত্রিশ) দিন আগে লিখিতভাবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

অধঃস্তন আদালতের বিচারকেরাও সরকারী কর্মকর্তা এবং নির্ধারিত কর্মস্থলে চাকুরীর মেয়াদ ও চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সীমারেখা তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নির্ধারিত কর্মস্থল থেকে যখন কোন বিচারক বদলী হন অথবা বয়সের কারণে অবসরে যান , তখন তাঁর বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করা হয়। এই প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। সাধারনত সংশ্লিষ্ট বিচারকের সহকর্মী-গন , তাঁর অধীনস্থ কর্মচারীগণ ও আইনজীবীগণ এরূপ বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করে থাকেন। একত্রে কাজ করার পর যখন কেউ বদলী হন তখন তাঁকে বিদায় দেওয়া এবং তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়া বিনয়ী ও ভদ্রলোকদের কাজ। এই সকল অনুষ্ঠান আবেগ-ঘন বেদনা বিধুর পরিবেশেই সম্পন্ন হয়। এই সকল অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি রচিত ‘নয়নভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল …’ গানটি পাওয়া হয়। আবৃত্তি করা হয় বিশ্বকবি রচিত,

‘… এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গ মর্ত ছেয়ে / সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে/ গভীর ক্রন্দন-যেতে নাহি দিব । হায় , / তবু যেতে দিতে হয়। তবু চলে যায়। / চলিতেছে এমনি অনাদি কাল হতে।

প্রায় দুই যুগ আগে একজন প্রবীণ জেলা জজ তাঁর অধীনস্থ বিচারকদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, বিচারক তাঁর খাস কামড়ার চার দেওয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত ; এই চার দেওয়ালের কোনটাই কিন্তু তাঁর বন্ধু নয়। নতুন কর্মস্থলে বিচারক যোগদান করে প্রথম আদেশ দেবার সাথে সাথেই তাঁর একজন শত্রু পয়দা হয়। কারণ আদেশটি যার বিপক্ষে যায় সে বিচারকের প্রতি রুষ্ট হয়। সুযোগ বুঝে সে তার অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সুযোগ ও পরিবেশ না পেলে এই বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি সাধু সেজে থাকে।

একজন বিচারক অবসর গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তার বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করা হলো। বক্তৃতা পর্বের এক পর্যায়ে একজন প্রবীণ আইনজীবী আক্ষেপ করে বললেন বর্তমান বিদায়ী বিচারকের পূর্বসূরি একজন বিচারক অবসর গ্রহণ করেছেন; সৎ দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। অনেক চেষ্টা করেও তার জন্য কোন বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সম্ভব হয় নাই। বক্তা-আইনজীবী ঐ সময়ে সমিতির সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা বিফল হয়। নিজের এই অক্ষমতা ও অপারগতার জন্য তিনি এই বিদায় অনুষ্ঠানে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করলেন। সভায় উপস্থিত আইনজীবীগণও এই অনুশোচনার সাথে একাত্ম হলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে ঐ বিচারক কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ দুনীতির দায়ে অভিযুক্ত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিপক্ষে গিয়েছিল । তাই ঐ বিচারকের প্রতি উক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ( যিনি দুনীতি মামলার আসামী ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিলেন। তার আরোপিত প্রতিবন্ধকতাই বক্তা-আইনজীবী / সমিতির সাবেক সভাপতির ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল।

আর একজন বিচারক তাঁর কর্মস্থলে সুনাম ও সততার সাথে তিন বৎসরেরও অধিকাল দায়িত্ব পালন করলেন। তাঁর বদলীর আদেশ আসলো। এবার সভাপতি সাহেব বিচারক মহোদয়ের কাছে কিছু আবদার করলেন। এই আবদার সমূহ রাখা হলে বিচার-প্রার্থী জনগণ , আদালতের কর্মচারীবৃন্দ , বিজ্ঞ আইনজীবী-গণসহ সকলের কাছেই এই সদাচারী বিচারকের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট হবে। তাই সভাপতি সাহেবের এইসব আবদার রক্ষা করতে বিজ্ঞ বিচারক অপারগতা প্রকাশ করলেন। ফল হলো এই , তাঁর বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করতে সভাপতি সাহেব তীব্র বিরোধিতায় লিপ্ত হলেন।

ঐ জেলায় বিচারক মহোদয় নিজ কর্ম-গুণে সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রশংসা-ভাজন ব্যক্তি ছিলেন। সভাপতি সাহেবের আপত্তি উপেক্ষা করে নবীন প্রবীণ আইনজীবীগণ দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রাজ্ঞ বিচারকের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। তরুণ আইনজীবী দ্ব্যর্থ-হীন ভাষায় শ্রোতৃমণ্ডলীর মুহুর্মূহু করতালির মধ্যে বললেন , বিদায়ী বিজ্ঞ বিচারক তাঁর বিচারিক কর্ম ও বিচার প্রশাসন পরিচালনার মাধ্যমে ‘দুষ্ট চক্রে’র প্রতি প্রচণ্ড আঘাত হেনেছেন ; ফলে তাদের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আদালত প্রাঙ্গণ মুক্ত থেকেছে। সভাপতি সাহেবের এই আচরণের কারণে তার প্রতি সাধারণ আইনজীবীগণ খুবই ক্ষুব্ধ হলেন।

এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সমিতির নির্বাচনে। এর দুমাস পরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই সভাপতি সাহেব পুরো প্যানেলে করুণ ও লজ্জাকর-ভাবে পরাজিত হন। ভীতি বা অনুগ্রহ , অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করতে বিচারকগণ অঙ্গীকারাবদ্ধ। বিচার-কর্ম ও বিচার প্রশাসনের ক্ষেত্রে তাঁরা এই অঙ্গীকারের প্রতি প্রবল আস্থা রেখেই নিজ নিজ এখতিয়ার মতো অর্পিত দায়িত্ব সমূহ পালন করে থাকেন। জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে তাঁরা বিচার-কর্ম করেন না। তাঁদের কৃত বিচার-কর্ম যখন সততা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ন্যায়ানুগভাবে সম্পাদিত হয় ; তখন আপনা আপনিই জনপ্রিয়তার মুকুট তাঁদের শিরে শোভা পায়। জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে বিচার-কর্ম পরিচালিত হলে বিচার ক্ষেত্রে বিভ্রাট ঘটে।

সচেতনভাবে এই বিষয়গুলো উপলব্ধিতে রেখেই বিচারকেরা বিচার-কর্ম করে থাকেন। তাঁরা বিচার-কর্ম করতে গিয়ে আইনজীবীদের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হন। বিদায়ের সময় কতিপয়ের স্বার্থ ক্ষুন্নতার কারণে বিচারকদের সম্পর্কে কেউ যখন নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করে তখন বিচারক মহলে মনোবেদনার কারণ ঘটে। যা অনেক সময় তাঁদের উত্তরসূরি পরম্পরায় সঞ্চারিত হতে থাকে। এর ফলে আদালত প্রাঙ্গণের স্বাভাবিক পরিবেশে ব্যাহত হয়। যদিও এর জন্য সামগ্রিকভাবে আইনজীবী সমাজ দায়ী নন, কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণ-হীন কিছু অপরিণামদর্শী সদস্যের কারণেই এটা ঘটে থাকে। এই নিয়ন্ত্রণ-হীন সদস্যদের কাছে সাধারণ আইনজীবীগণ এসব ক্ষেত্রে অসহায়। তবুও দায়দায়িত্ব তো সবার উপরই বর্তায়। সততা নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালনের পর বিদায়ের সময় বিচারককে নিয়ে অসৌজন্যমূলক বিতর্ক কোন যুক্তিতেই কাম্য নয়। আইনজীবীদের তরফ থেকে বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেই এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় , যা গোটা পরিবেশকেই করে তোলে অশানত্দ , কলহ-উপদ্রুত।

তাই বিচারকদের সাথে আইনজীবীদের সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থেই আইনজীবী সমিতি কর্তৃক বিচারকদের বিদায় সম্বর্ধনা জানানোর এই প্রথার অবসান ঘটানো প্রয়োজন।

Advertisements

5 comments

  1. মানুষ মৃত্যুর পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন বিচার করবেন। দুনিয়াতে সেই প্রতিকি বিচার হিসাবে বিচারকের এস্থান। কিন্তু বর্তমানের আওয়ামী বিচারকরা কি করছে? ফাসি ও খুনের আসামি ছেরে দিয়ে সমাজে বিপর্যয় ঘটাচ্ছে আর ধার্মিক ও নিরাপরাধ মানুষ কে প্রহসনের বিচারে মাসের পর মাস বচরের পর বছর আটকে রাকচে। মৃত্যুর পরে মহান আল্লাহ ওদের কি বিচার করবেন জানি না, তবে জনতার আদালতে এই সব বাক শালি বিচারকদের এমন বিচার করা উচিৎ যাতে মনের ভুলেও ভবিষ্যতে এই বাক্ শালি বিচার কায়েম করার সুযোগ না পায়। স্রদ্ধেয় বাংলা ভাই হয়ত সেই প্রকল্পই হাতে নিয়েছিলেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s