বাংলাদেশ নাও চিনে..

উমর

আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যে ঢাকাতে হবে তা জানার পর থেকে যতটা আনন্দিত হয়েছি, স্বীকার করতেই হবে তার চেয়ে বহুগুন উতকন্ঠা ছিলো এর সফলতা নিয়ে।

বিশেষ করে এর পারফরমার কারা হবে তা নিয়ে ব্লগের চলমান বিতর্ক এই উতকন্ঠাকেই আশংকায় পরিনত করে ফেলেছিলো। ঢাকার বুকে প্রানের বিশ্বকাপের উদ্বোধন হচ্ছে, সারা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকরা ডেকা ডেকা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে আর তখন কিছু বলিউড তারকা আর জনৈকা রহমান নর্তন কুর্দন করে তাদের বরন করে নিচ্ছে, এরকম একটা দুঃস্বপ্ন প্রায়ই তাড়া করে ফিরেছে গত কয়েক মাস ।

শেষ পর্যন্ত যখন হাজার হাজার কাউন্ট ডাউন টাইমার থেমে গেলো, আর রাস্তার সব গুলো পথ নির্দেশক তীর ঘুরে গেলো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের দিকে, তখন আর সহ্য হলো না। ভীরু পায়ে টিভির সামনে ঠিকই এসে বসে পড়লাম। এমনকী এটাও জানতাম না যে কোন চ্যানেল দেখাবে অনুষ্ঠানটা। বিটিভি তে চৌধুরী জাফর উল্লাহ শরাফাত মেঘ মুক্ত মাঠ নিয়ে কিছু বলছিলেন মনে হয়। আমি সেই সুযোগে টিভি গাইড দেখে ইএসপিএন আর স্টার ক্রিকেট টিউন করে ফেলেছি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সঙ্গীত বা আমন্ত্রিত অতিথি বরন পর্ব এবং তারপর প্রথম পরিবেশনায় মিলা, মিলা, এবং মিলার একটা গান ছিলো। অর্নব, কনা, তপু এদেরকে এক ঝলক করে দেখার সুযোগ হলেও অতি রসিক ক্যামেরা যেন ইভটিজারের চোখ দিয়ে মেপে দেখেছিলো দেশের অন্যতম এই পারফরমারের নৃত্যশৈলী। তাই ‘ও পৃথিবী এবার এসে বাংলাদেশ নাও চিনে’ গানটা দিয়ে মিলাই যেন বিশ্ববাসীকেই বরন করে নিলো বাংলার ক্রিকেট প্রিয় জনতার পক্ষ থেকে।

এরপরের অংশে ছিলো অধিনায়কদের প্রবেশ, ফেয়ার প্লে’র প্রতীক হিসেবে শিশুদের হাত ধরে জমকালো রিক্সায় করে একে একে বারোটি দেশের অধিনায়কদের গন মাঠে এসে নামলেন। অধিনায়ক দের দিকে যতটা না তাকিয়েছি তার চেয়ে সেই শিশু আর রিক্সাওয়ালাদের মুখগুলো দেখতেই ভালো লাগছিলো বেশী।ওখানকার সবাইকেই ভালো লাগলেও, ভালো লাগেনি বিসিবি সভাপতি আর অন্যান্য মন্ত্রীদের ভাষন। তারা যে ভাষায় বক্তৃতা করেছেন সেই তৈল মিশ্রিত সুর বিশ্ববাসীকে শোনানোর কোনও প্রয়োজন ছিলো বলে আমি মনে করি না। গতানুগতিক আর ছোট একটা ভাষনের মাধ্যমে সকলকে ধন্যবাদ দিয়েই শেষ করা যেত এই পর্ব। কক্সবাজারে স্টেডিয়ামের দাবী তোলা বা টাকার অঙ্ক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মতো সস্তা তোষামোদ করার জন্যে এই মাঠের চেয়ে পল্টনের মাঠই বেশী উপযুক্ত ছিলো।

সমালোচনার উর্ধে উঠতে পারে না প্রধানমন্ত্রীর ভাষনও, প্রথমেই ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারনে বংগবন্ধুকে স্বরন করার সময় আপনা আপনিই আমার মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছিলো বদরুদ্দীন উমরের সেই বিখ্যাত উক্তি, “বাংলাদেশের সরকারি ইতিহাসে সত্যই হল সব থেকে বড় শহীদ”। এছাড়া উদ্বোধনের ঘোষনা দেয়ার সময় ২০১১ না বলে ২০০১ বলাটা বিরাট একটা রাজনৈতিক ভূল হয়ে গেছে তার জন্যে, কারন বিরোধী দল যে দাবী করছে এই সরকারের আমলে দেশ ১০ বছর পিছিয়ে গেছে, তার সপক্ষের প্রমান হিসেবে একে তারা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে প্রচার করতে পারে জনগনের সামনে।

তবে এইসব ছোট ছোট ত্রুটিকে ছাপিয়ে গেছে বড় বড় মুগ্ধতা। ভ্যানে করে স্টাম্পি’র স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিয়ে অনেকে বাঁকা চোখে তাকালেও তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই দিল্লীতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসের কথা, সেখানেও রিক্সা ব্যবহার করা হয়েছিলো মাঠের ভেতর। প্রতিটি দেশই চায় নিজেদের সংষ্কৃতি আর ঐতিহ্য কে তুলে ধরতে, রিক্সা-ভ্যান এসবের নামটি পর্যন্ত বাংলা না হলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে এই তিন চাকার যানবাহনগুলো যে কতটা নিখুত ভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছে তা অনুষ্ঠান দেখা যে কোনো বাঙ্গালী-ই নির্দিধায় স্বীকার করবেন।

ঠিক এই সময় আমার চারপাশে বিষ্ফোরনের শব্দে চমকে উঠলাম, ইলেক্ট্রিসিটিও চলে গেলো। জানালার কাঁচ ভেদ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সারা আকাশ লাল নীল আভায় আলোকিত হয়ে গেছে। একটু পর পর আতশ বাজীর ঝলক দেখতে গিয়ে কিছুটা অংশ দেখা হয়নি অনুষ্ঠানের। অপূর্ব সেই আলোর খেলা দেখার সময় মনে হচ্ছিলো অনুষ্ঠানটা হচ্ছে বাড়ীর পাশেই কোথাও। বিভিন্ন জায়গায় থাকা বন্ধুদের কাছ থেকে জানলাম সারা দেশেই একযোগে এই আতসবাজীর আয়োজন করা হয়েছিলো।

যখন ইলেক্ট্রিসিটি এলো তখন শুরু হয়ে গেছে তিন জাতির সাংষ্কৃতিক পরিবেশনা। ডিশের চ্যানেল গুলো ঝিল ঝিল করায় ভারতের প্রদর্শনীটা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে চোখ আর মন দুইটাই জুড়িয়ে গেছে লঙ্কার পরিবেশনা দেখে। ঝিনুকের মাঝ থেকে বেরিয়ে আসা রাজকুমারী, আর নৌকা নিয়ে স্টেডিয়ামের শুকনো মাঠে সমুদ্রের আবহ এত নিখুঁত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে তা মনের আঙ্গিনায় স্থায়ী ভাবে জায়গা করে নিয়েছে তখনই।

লঙ্কা আর ভারতের পর স্বাগতিক দের পালা নিজেদের পরিচয় করিয়ে দেবার। একে একে গান পরিবেশন করলেন সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা আর মমতাজ। রুনা লায়লার উর্দু গান কিছুটা বেখাপ্পা শোনালেও সেটাকে সমালোচনার উর্ধেই রাখছি কারন তিনি নিঃসন্দেহে বাংলা আর উর্দু দুই ভাষারই কিংবদন্তী শিল্পী। তবে মমতাজ কে নিয়ে ব্লগ দুনিয়ায় বেশ ভালোই সমালোচনা হয়েছে, এটা সত্যি যে তার গাওয়া প্রতিটি গানই প্রচন্ডভাবে জনপ্রিয় শ্রোতামহলে। তবে এই পরিবেশনা চলাকালীন সময়ে ভীষনভাবে অভাব বোধ করেছি জেমসের। জেমসের উপস্থিতি অনেকটাই তারুন্য চঞ্চল করে তুলতে পারতো এই মঞ্চটাকে।

এই তিন শিল্পীর পরিবেশনার পর লোকজ ঐতিহ্যের নৃত্য দিয়ে একে একে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলার মানুষের সাংষ্কৃতিক স্বাতন্ত্র। সব কিছু ছাপিয়ে যাওয়া এই পরিবেশনার মাঝে মুক্তিযুদ্ধের অংশে বংগবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের অংশ প্রদর্শন খুব একটা অযৌক্তিক ছিলো না, তবে তীব্র সমালোচনা হওয়া উচিত ভাষা আন্দোলনের মিছিলকারীদের পোষাক হিসেবে মুজিব কোট বেছে নেওয়াকে। সফল অনুষ্টান আয়োজনের জন্য সাধুবাদের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের মত স্পর্শকাতর ইতিহাসকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপনার জন্য নিন্দা কুড়াতেই হবে আয়োজকদের।

সব মিলিয়ে অনুষ্ঠান দেখার পর মুগ্ধতার রেশ কাটিয়ে উঠার আগেই ব্লগ দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে চাই আমার ভাবনা। আর আমার এবং অগনিত ক্রিকেটপ্রেমীর দুঃস্বপ্নকে মিথ্যা আর অমূলক প্রমান করার কারনে মুক্ত কন্ঠে আয়োজকদের ধন্যবাদ দিতে চাই আরেকবাব। আর যে অংশগুলো দৃষ্টি কটু লেগেছে, সেগুলোকেও যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষন করতে চেয়েছি। তবে ব্রায়ান এডামসের সামার অফ সিক্সটি নাইন গানটার নস্টালজিক সুর, আর সনু নিগমের অদ্ভূত ভালোলাগার গানটা ছাপিয়ে বার বারই কানে বাজছে টাইগারদের বিজয় উল্লাসের ধ্বনি। আজকের এই সফলতা তখনই স্বার্থক হবে যখন বিজয় মিছিল নিয়ে বের হবে সেই পরিচিত রাজপথে। সবশেষে আমাদের ক্রিকেট টিমের জন্য শুভকামনা রইলো আমার এবং সকলের পক্ষ থেকে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

One comment

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s