বিপণন বিজ্ঞাপন এবং আব্রু

রোমেল রহমান

মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণের জন্য তাকে প্রতিদিনই উৎপাদনমুখী কাজে অংশ নিতে হয়। মানুষ শুধু নিজের প্রয়োজনের জন্যই উৎপাদন করে না , সমাজের চাহিদা মেটাবার জন্যও উৎপাদন করে। উৎপাদিত যে দ্রব্যের মধ্যে মানুষের অভাব পূরণের ক্ষমতা বা উপযোগিতা আছে, সে দ্রব্য সকলেই পেতে চায়। এই চাহিদা পূরণের জন্যই মানুষ উৎপাদন কাজে অংশ গ্রহণ করে। নিজের এবং সমাজের চাহিদা পূরণের জন্য মানুষ দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন করে। উৎপাদিত দ্রব্য সমাজের চাহিদা মেটাবার জন্য বাজারজাত করা হয়। এই পণ্য বিক্রয় করে উৎপাদনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অর্জন করে মুনাফা।

বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পুঁজিপতিগণ পুঁজি বিনিয়োগ করে থাকে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে। উৎপাদনের ক্ষেত্র সমূহ ব্যাপক। কৃষি , শিল্প ও সেবা খাতে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী উৎপাদিত হয়। বহুমুখী ধারায় বিভক্ত এইসব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত পণ্য ভোক্তাদের মাঝে বিক্রয় করার মাধ্যমেই উৎপাদনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অর্জন করে মুনাফা। এর জন্য প্রয়োজন হয় বাজার। এই বাজার ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনকারীদের মধ্যে নিজের উৎপাদিত পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে রয়েছে প্রতিযোগিতা। অপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিক্রেতা ও ক্রেতার সংখ্যা অসীম নয়। সমজাতীয় হলেও গুণাগুণের বিচারে একের সাথে অন্যের পার্থক্য ও বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে। নিজ নিজ উৎপাদিত পণ্যের মাহাত্ম বর্ণনা করে উৎপাদনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পত্র পত্রিকা এবং রেডিও ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রচার করে । উদ্দেশ্য ঐ সব পণ্য ক্রয়ের প্রতি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা। হাল জমানায় ইলেকট্রনিক গণ-মাধ্যমগুলি জনমত গঠনে অত্যনত্দ কার্যকরীভাবে প্রভাব বিসত্দার করে চলেছে। সে কারণেই নিজের উৎপাদিত পণ্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়াবার জন্য উৎপাদনকারীগণ এই গণ-মাধ্যমকেই বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য গুরুত্ব সহকারে বেছে নিয়ে থাকেন।

বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ক্ষুদ্র দৈর্ঘের চলচ্চিত্র তৈরী করা হয়। স্বাভাবিকভাবে এইসব চলচ্চিত্রে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের শ্রুতিমধুর কথোপকথন আর দৃষ্টিনন্দিত অভিনয়ের মাধ্যমেই বিজ্ঞাপনদাতার পণ্যের গুণাগুণ উপকারিতা ও উপযোগিতা বর্ণনা করা হয়। আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দিত করার জন্য অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সাজসজ্জার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়। তা করতে গিয়ে অনেক সময় মেয়েদেরকে এরূপ বেশভূষায় ভূষিত করা হয় , যা দৃষ্টিলজ্জার কারণ হয়ে যায়। পোশাক মানুষের শীত ও লজ্জা নিবারণ করে , সেই সাথে তাকে করে তোলে সৌন্দর্যমন্ডিত ও দৃষ্টিনন্দিত। লজ্জা নিবারণের ক্ষেত্রে লজ্জাস্থান সম্পর্কিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহ আবৃত করে তা অন্যের দৃষ্টির আড়াল করার জন্য পোশাকের কোনো বিকল্প নাই। শালীন ভঙ্গিতে বস্ত্র পরিধান করেই আব্রু রক্ষা করতে হয়। পোশাক ও অংলকার মেয়েদেরকে করে মোহিনী। এ ক্ষেত্রে কিছু রীতি নীতি রয়েছে। প্রতিটি মানুষকেই আল্লাহ সুন্দর অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। নর ও নারী উভয়ের সৌন্দর্যই বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করে ; সেই সাথে অনেক সময় তা হয়ে যায় সমলিঙ্গের ঈর্ষার কারণ। এটা সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম। আকর্ষণ ও ঈর্ষা এ দুটোই নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলেই মানুষ দ্বন্ধ সংঘাতে লিপ্ত হয়। বিপন্ন হয় সংশ্লিষ্টদের জীবনের শানত্দি শৃঙ্খলা , যা অন্যদের জীবন ও পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। সে কারণেই সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান ও সৌন্দর্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ আরোপ করে সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। এই বিধি নিষেধ মেনে চলার নামই হচ্ছে শালীনভাবে চলা ও আব্রু রক্ষা করা। এর ব্যত্যয় ঘটলেই চারদিক থেকে নিন্দার রোল উঠে। পড়ে যায় ঢি ঢি রব। অভিনয় ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য।

ইলেকট্রনিক গণ-মাধ্যমে বিজ্ঞাপন সম্পর্কিত চলচ্চিত্রে অভিনেত্রীদের কারো কারো কোন কোন পোশাকের বেলায় শালীনতা ও আব্রু সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণার বরখেলাপ দেখা যায়। জাতীয় পতাকার রঙের পোশাক পরিধান করে ‘ … আমাদের এ বসুন্ধরা /… ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা…’ গান গাইলেই হবে না , গায়িকার পোশাকও আব্রুসম্মত হতে হবে। আমাদের দেশের খ্যাতিমান সঙ্গীত ও নৃত্য শিল্পীগণ আনর্ত্দজাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে অনেক মর্যাদার আসনে আসীন করেছেন , তাঁরা কিন্তু মঞ্চে সঙ্গীত বা নৃত্য পরিবেশনের সময় পোশাক ও সাজসজ্জার ক্ষেত্রে শালীনতা ও আব্রু রক্ষার ব্যাপারে অত্যনত্দ সচেতন থাকেন। এর এতটুকু হেরফের হলে জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামে। প্রাতঃভ্রমণে বুকফাড়া ‘জ্যাকেটে’র বুকের চেন খুলে দিয়ে কোন বাঙালী যুবতী পর-পুরুষের মনে গানের অনুরণন জাগায় না। তবুও এরূপ দৃশ্য ইলেকট্রনিক গণ-মাধ্যমের গুণে আমাদেরকে দেখতে হয়। এটা পণ্যের ক্রেতা সংখ্যা বাড়াতে কতটুকু সহায়ক তা বিজ্ঞাপনদাতা ব্যক্তিগণ অথবা প্রতিষ্ঠান সমূহ বলতে পারবে। তবে এটা নিসন্দেহে বলা যায় যে এরূপ চলচ্চিত্র আমাদের তরুণ-তরুণীদের কাছে সামাজিক জীবনবোধ সম্পর্কে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়।

বেশ কয়েক বৎসর আগে ভিনদেশী একটি ইলেকট্রনিক গণ-মাধ্যমে একটি নাটক প্রচারিত হয়। তার একটি অঙ্কে দেখা যায় প্রবীণ শিক্ষকের বাসায় পড়তে এসেছে তাঁর এক ছাত্রী । তরুণী এই শিক্ষাথর্ী সুন্দর সাজগোজ করে এসেছে। তার পরণে সুদৃশ্য সালোয়ার ও কামিজ ; তবে ওড়না নাই। এজন্য মেয়েটাকে গুরুপত্নী অত্যনত্দ গালমন্দ করলেন। মেয়েটার সাজসজ্জাকে নোংরা বলে অভিহিত করলেন। মেয়েটাকে জানিয়ে দিলেন শিক্ষক প্রবীণ ও পিতৃতুল্য হলেও তাঁর সামনে আব্রু রক্ষা করে শালীন পোশাক পড়ে আসতে হবে। কোন রুচিশীল ভদ্র পরিবারের সনত্দান বে-আব্রু হয়ে অশালীন পোশাক পরে চলাফেরা করতে পারে না। এই দৃশ্য ও কথোপকথন সকল দর্শক-শ্রোতাকে জানিয়ে দিলো অশালীন পোশাক পড়ে বে-আব্রু হয়ে চলা সামাজিক নৈতিক রীতিনীতি , আদব-কায়দা ও শৃঙ্খলার পরিপন্থি।

১৯৭৭ সালের চলচ্চিত্র সেন্সর বিধিমালা অনুসারে চলচ্চিত্র প্রদর্শণের আগে ‘মুক্তির সনদ’ নিতে হয়। এরূপ সনদ দেবার আগে বিবেচ্য নির্দেশনায় চলচ্চিত্র প্রদর্শণের জন্য সনদ প্রদানের বিষয়ে শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর পরিপন্থি দৃশ্য থাকলে তা প্রদর্শণের জন্য সনদ দিতে বারণ করা হয়েছে। তা হচ্ছে : ‘ অনৈতিক পাপপূর্ণ ও লাম্পট্যময় কাজে উৎসাহিত করে অথবা নৈতিকতা ও পবিত্রতার প্রচলিত ধারণা সমূহ নস্যাৎ করে এরূপ দৃশ্য। নগ্নতা , ধর্ষণ ও যৌনমিলন সম্বলিত দৃশ্য। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অশ্লীল ভঙ্গি সম্বলিত দৃশ্য। অভদ্রচিত পোশাক পরিহিত দৃশ্য। চুম্বন ও আলিঙ্গনের দৃশ্য । ‘

এর বরখেলাপ সভ্য সমাজে কাম্য নয়। নগ্নতা প্রগতির পরিচায়ক নয়। যে সমাজে মানুষ পোশাক পড়ে না তাকে কখনোই সভ্য সমাজ বলে না , এরূপ সমাজের লোকেরা পোশাক পরা শুরু করার সময় থেকেই তাদের সভ্যতার পথে যাত্রার সূচনা হয়। ইলেকট্রনিক গণ-মাধ্যমে প্রচারিত চলচ্চিত্রের অভিনেতা অভিনেত্রীদের পোশাক পরিচ্ছদ , চলন বলন এসব কিছুই অনুকরণপ্রবণ তরুণ তরুণীদের আকৃষ্ট করে। সে কারণেই এইসব অভিনেতা অভিনেত্রীদের সাজসজ্জা ও আচার আচরণ হতে হবে শালীন ও আব্রুসম্মত। পণ্যের প্রচার ও প্রসারের চাইতে এ দিকটি আরো বেশী গুরুত্ব বহণ করে। ছবি সমূহে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকতে হবে। নতুন প্রজন্মকে নৈতিকতার পথে চলতে এবং শালীনতা ও আব্রু বজায় রাখতে শিক্ষাদানের ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমাদেরই।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s