মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ‘টুইটার বিপ্লব’ নিয়ে আমার কিছু কথা

ইদানিং ব্লগ ও অন্যান্য মাধ্যমে বেশ বিতর্ক হচ্ছে ব্যপারটা নিয়ে। ইরানের নির্বাচনের সময় প্রথমবার ‘টুইটার বিপ্লব’ শব্দটার সাথে আমরা পরিচিত হই। বলা হয় সংষ্কারপন্থী দলের নেতৃত্বে পুনঃনির্বাচনের যে আন্দোলন আমরা দেখেছি তা আসলে পুরোপুরি ফেসবুক ও টুইটারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। সামাজিক সাইট গুলোর মাঝে তুলনামূলকভাবে নবীন ও উন্মুক্ত এই টুইটার তখন ইরানের সর্বশেষ সংবাদ প্রচারে অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিলো নিজেদের সাইট জনিত বিভিন্ন সমস্যা উপেক্ষা করে। একই রকম ভাবে সাম্প্রতিক কালে তিউনিশিয়া মিশর জর্ডান সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে একনায়কদের বিরুদ্ধে জনগনের পরিবর্তনের যে আন্দোলনের খবর বিশ্ব মাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে তাকেও টুইটার বিপ্লব হিসেবেই দেখছেন অনেকে। অনেক সংবাদ মাধ্যমেও বলা হচ্ছে যে সামাজিক সাইটগুলোই এই সব বিক্ষোভের মূল কারন। আর তার ফল স্বরুপ অন্যান্য দেশেও সামাজিক সাইটগুলোতে পরিবর্তন কামীদের সংগঠিত হতে দেখা যাচ্ছে।

তবে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের কলাম লেখক ইভজেনি মরজোভ এই ধারনার সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, তিউনিশিয়া বা মিশরের চলমান পরিস্থিতির জন্য টুইটার বা ফেসবুককে একমাত্র নিয়ামক মনে করাটা বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ন নয়, এটি একধরনের সাইবার ইউটোপিয়ানিজম মাত্র। সাইবার ইউটোপিয়ানরা যেরকম ইন্টারনেটকে একটি মহা শক্তিধর মাধ্যম মনে করেন যা ব্যবহার করে অসাধ্য সাধন করা সম্ভব, সেরকম অনেকেই মনে করছেন ফেসবুকের একটি ইভেন্ট বা কিছু টুইটার ব্যবহারকারী নেটের মাধ্যমে একত্রিত হয়ে একটি দেশের স্বৈরশাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলেছেন। কিন্তু আমাদের সাথে সাথে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে এই সকল একনায়কের পতন শুধু একটি বা দুইটি কারনে ঘটেনি। এমনকি এটা মনে করাটাও ভূল হবে যে একজন উচ্চশিক্ষিত বেকার কে রাস্তায় ফল বিক্রয়ের সময় উচ্ছেদ করার প্রতিবাদে আত্বহুতি দেয়ার কারনে এত বছরের রাজত্ব পরিচালনা করা সরকারের পতন ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে সেখানকার যে জনবিস্ফোরন আমরা টিভি পর্দায় দেখেছি অথবা মিশরে এখনো দেখছি তা আসলে বহু বছরের পুঞ্জিত ক্ষোভের বহিপ্রকাশ। একটি দেশের রাজনৈতিক বিন্যাস পরিবর্তন করতে অনেক সুক্ষ বিষয় কাজ করে, সেগুলোকে বাদ দিয়ে সাদা চোখে তাকে ‘টুইটার বিপ্লব’ হিসেবে দেখাটা অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যা হয়ে যায়।

 

আগের দিনের স্বৈরশাসকগন বিক্ষোভ দমনে ‘ব্লাক আউট’ পদ্ধতি কাজে লাগাতেন। এর মানে হলো কোথাও জনগন রাস্তায় নামলেই সমস্ত মিডিয়া বন্ধ করে দিয়ে সব দিক দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভংগ করে দেয়া। কারন এর ফলে বিক্ষোভ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৭১ সালেও আমাদের দেশে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর আগে পাকবাহিনী সমস্ত বিদেশী সাংবাদিকদের ধরে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলো। মাত্র তিন জন সাংবাদিক এদের হাত থেকে রেহাই না পেলে এই গনহত্যাও হয়তো বিশ্ববাসীর অজানাই থেকে যেত অনেক দিন। এরই রেশ ধরে আধুনিক বিশ্বের একনায়ক গনও যখনই পরিস্থিতি নিজেদের প্রতিকূলে চলে যায় তখনই ইন্টারনেট সহ বাকী সব মিডিয়া বন্ধ করে দেন। আর তখনই আমরা আবিষ্কার করি কোনও মিডিয়ার সাহায্য ছাড়াই বিপ্লব দ্বিগুন উদ্যমে চলছে, কারন বিপ্লব সংগঠনের জন্য মিডিয়ার বিশেষ ভূমিকা থাকলেও, একবার রাস্তায় পৌছে যেতে পারলে বিপ্লব আর মিডিয়ার উপর নির্ভরশীল থাকে না।

 

আর আমরা যে বিপ্লবে যে তথ্যপ্রযুক্তির অন্তর্ভূক্তির কথা বলি, সেই তথ্যের প্রবাহ একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রন করে সরকার। তাই স্বাভাবিক ভাবেই সরকারপন্থীদেরই এধরনের মুভমেন্টে প্রাধান্য থাকার কথা ছিলো, কিন্তু তা কখনোই হয় না, বরং বাস্তব জীবনে অসন্তোষ যতই বাড়তে থাকে মিডিয়াগুলোতে ততই সরকার বিরোধীদের দল ভারী হতে থাকে। আর তখন সরকার মিডিয়া নিয়ন্ত্রনে নিয়েও কিছু করতে পারে না। উদাহরন স্বরুপ বলা যায়, তিউনিশিয়াতে বেন আলীর সরকার সেখানকার প্রায় প্রত্যেক ব্যবহারকারীর ফেসবুক আইডি হ্যাক করেছিলো, মিশরে হোসনী মোবারকের সরকার ইন্টারনেটের লাইনই বন্ধ করে দিয়েছিলো যার ফলে বহির্বিশ্ব মিশরের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েক দিন একেবারে অন্ধকারে ছিলো। কিন্তু তার কারনে বিক্ষোভের মাত্রা কমে যায় নি বরং তা আরও বেগবান হয়েছে। কারন ফেসবুক বা টুইটার তখন আর এই বিক্ষোভের নিয়ন্তা ছিলো না। এটি তখন পরিচালিত হচ্ছিলো বিপ্লবের চিরচারিত নিয়মে, রাজপথ, জনতা আর নেতৃত্বের পরিচিত রসায়নে।

 

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে ফেসবুক বা টুইটারের ভূমিকাটা কি ছিলো এই ঘটনাতে? অথবা আদৌ ছিলো কি? হ্যা ছিলো, খুব ভালো ভাবেই ছিলো। বিদ্যুত গতিতে তথ্যের আদান প্রদান অবশ্যই বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়াতে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটা সত্য যে রাস্তায় উন্মত্ত জনতার সামনে গুলি করে মানুষ হত্যা সেখানে উপস্থিতদের মাঝে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে একটি টুইটের মাধমে সেই খবর জেনে সেরকম প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা না, কিন্তু এই সকল টুইট বা স্ট্যাটাস অনেক বেশী মানুষকে ঘর থেকে বের করে রাজপথে নিয়ে এসেছে সেটা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে।আর এই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক ভাবেই আসতে পারে যে ফেসবুক বা টুইটার না থাকলে কি এই সব বিদ্রোহ দানা বেধে উঠতে পারতো? এটিই আসলে এই বিতর্কের সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন। যদি বলা হয় ইন্টারনেট এইসকল ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকাই রাখেনি তাহলে তা সত্যের অপলাপ হবে, কারন যোগাযোগ মাধ্যমের এই শক্তিকে আজকের যুগে বসে আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

 

শেষ কথা হিসেবে বলা যায় যে, সত্যিকারের অস্ত্র হিসেবে আমরা যদি কাউকে কল্পনা করতেই চাই তাহলে তা হবে যোগাযোগ মাধ্যম নিজেই। মধ্যযুগে ঘোড়ার ডাক বা পায়রার পায়ে বাধা চিঠি যেভাবে যুদ্ধকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে বা পরবর্তীতে করেছে টেলিগ্রাম, ফ্যাক্স বা টেলিফোন, আজকে সেই কাজটাই করছে ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিও গুলো। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকাই আসলে অবিরত পালন করে যাচ্ছে উন্নততর এই মাধ্যম গুলো। তাই বলে এইসবের উপস্থিতি বিপ্লবের চিরচারিত রূপ বদলে দেবে সেরকমটা আশা করাটা একেবারেই অমূলক আর প্রযুক্তির কাছে আমাদের অবাস্তব একটি প্রত্যাশা।

 

Advertisements

2 comments

  1. চমৎকার হয়েছে! ডিজিটাল এ যমানায় সরকার গঠন থেকে সরকার পতন, আন্দোলন, বিক্ষভ, বিপ্লব সব কিছুতেই ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি ব্যবহৃত হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s