একটা কবিতা লেখার পটভুমি (দিনলিপি থেকে)

উমর

নোয়াখালীতে তখন আমরা কেবল গিয়েছি। বিশাল বাসাটাকে নতুন উদ্যমে সাজিয়ে গুছিয়ে নেয়া হচ্ছে, নতুন জায়গা নতুন বাসা সব মিলিয়ে হুলুস্থুল অবস্থা! আমার ভাগে যে ঘরটা পড়েছিলো, সেটার সাথে লাগোয়া বারান্দা ছিলো। গ্রীল দিয়ে ঘেরা শহুরে বারান্দা না, রেলিং দেয়া দোতালার খোলা বারান্দা । যেখানে আপনি ইচ্ছা করলেই কোনো পূর্নিমার রাতে লাফ দিয়ে সব কিছু শেষ করে দিতে পারবেন। সেই বারান্দার সাথে ফাও পেয়েছিলাম একঝাক কবুতর, চোখ বন্ধ করলেই একটু পর পর পাখা ঝাপ্টানোর শব্দ, এখনো যেন মাঝে মাঝে শুনতে পাই। আমাদের আগে যে পরিবার এখানে থাকতো, তারা বেশ যত্ন করেই এদের পালতো মনে হয়। অনেকদিন পরে আমার অভিযোগের কারনে এই কবুতর গুলোকে সরিয়ে ছাদে বাসা করে দেয়া হয়েছিলো। অভিমান করেই হোক, বা  অন্য যে কোনো কারনে তারা এরপর থেকে পাশের গাছ গুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলো, ডিম পাড়ার সময়ে ঠিকই বারান্দার কোনো এক ফাঁকে চলে আসতো, তবে ছাদে ওদের এমনকী বসতেও দেখি নি কখনো। সে যাই হোক, শুরুতে যে কথা বলছিলাম, তখন বাসা গুছানোর প্রক্রিয়া চলছে, তার সাথে সাথে আমিও নিজের জগতটাকে রীতিমত যত্ন করে গুছিয়ে নিচ্ছি। তখন কেন জানি না, রাত হলেই বেড সাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে আমার লাল ডাইরী আর কলম নিয়ে বসে যেতাম, আর যা কিছু মাথায় আসতো তাই লিখে ফেলতাম। তখনকার ঐ ডাইরীর পাতা এখন যখন উল্টাই, দেখি একই দিনে অথবা পর পর টানা ভালো ভালো সব কবিতা আর গানে পাতার পর পাতা লেখা। সেই রকমই এক রাতে আমি ল্যাম্পের হলদে আলোতে ডাইরীর পাতা উল্টাচ্ছি, হঠাত অন্য রকম একটা অনুভুতি হলো। ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি নিয়ে নস্টালজিক হয়েই হবে হয়তো, সাদা কাগজে লিখে ফেললাম কয়েকটা লাইন:

“নির্ঘুমতার মেঘ ধীরে ধীরে কাটছে-
স্মৃতিপট থেকেও তুমি ক্রমশ বিস্মৃতির পথে..”

আশ্চর্য ! এর পর আর কিছুই মাথায় আসছে না ! এলোমেলো কিছু শব্দ বসালাম, নিজেরই ভালো লাগছে না। প্রথম দুই লাইনের নিস্পৃহতার সাথে কোনোভাবেই সন্ধি করাতে পারলাম না বাকী অংশটা। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিখে পরের লাইনে লিখলাম,

“চোখ মেললেই অনুভব করি, সকালের সুবাস আমাকে ঘিরে থাকে..”

তখন আমি মাত্র জীবনানন্দ দাস পড়া শুরু করেছি। এর আগে একাধিকবার বইখানা হাতে নিলেও বেশী ভেতরে ঢুকতে পারিনি কখনওই। প্রথম বার শিহরিত হয়েছিলাম ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতা টা পড়ে। এরপর থেকে শুরু, ক্রমশ ‘বোধ’, ‘অন্ধকার’,  ‘অবসরের গান’ কবিতা গুলো যেনো কখন যে আমারই কবিতা হয়ে গেলো পড়তে পড়তে টের-ও পাইনি। আমি তখন বুঁদ হয়ে আছি নিজের কবিতার শব্দজট ভেদ করতে, অনেক্ষন চেষ্টার পর রীতিমত হতাশ হয়ে ডাইরীটা বন্ধ করে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ তুলে নিলাম। ভাবলাম এখন কিছুক্ষন কবিতা পড়ি, পরে আবার মুড আসলে বাকী অংশটা লেখা যাবে।

২.
এরপর প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে, সেই রাতের অসমাপ্ত কবিতা অসম্পূর্ন রেখেই আমি মাড়িয়ে এসেছি অনেকটা পথ। একদিন শীতের সকালে ফোন বেজে উঠলো হঠাত। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে নারী কন্ঠে উত্তর আসলো। তার সাথে কিছুক্ষন কথা বলার পর বুঝতে পারলাম আসলে উনি নাম্বার লিখতে ভুল করেছেন, এবং যাকে চাইছেন তার কন্ঠস্বর অনেকটা আমার মতো। আমি সাধারনত ভোরে উঠতে পারি না, কারন অনেক রাতে ঘুমানো হয়। তাই সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেজাজ চড়ে গেলো। লেপ সরিয়ে বিছানা থেকে নামলাম, তখন ৭ টা বাজে। চারপাশে ঘন কুয়াশার আবরন, সিডি প্লেয়ার অন করতেই বেজে উঠলো Roxette এর It Must Have Been Love গানটা। অনেক পছন্দের একটা গান হঠাত করে শুনলে যে কারোই মন ভালো হয়ে যায়, যদিও আসলে এটা অসম্ভব রকমের মন খারাপ করা করা গান, তারপরও সকালের আমেজের সাথে সুরটা মন্দ লাগছিলো না।

“Lay a whisper, on my pillow~
Leave the winter, on the ground;
i wake up lonely, there’s air of silence-

in the bedroom, & all around..
Touch me now, I close my eyes..
&
dream away;
It must have been love, but it’s over now
It must have been good, but I lost it somehow
It must have been love, but it’s over now
from the moment we touched, till the time had run out..”

উদাস মুখে আমি ডাইরী টা হাতে নিলাম। খুলে কয়েক পৃষ্ঠা পড়তেই খুজে পেলাম সেই দুই লাইনের অসমাপ্ত কবিতা। আমি যেনো তৈরীই ছিলাম, এরকম ভাব করে লিখে চললাম,

“..অনুক্ষনে হয়ত তোমায় মনে পড়ে-
তবে তারপর, আর কখনোই না;
তোমায় নিয়ে উল্লাস ভরা পত্র লিখিনা;
আর তখনই বুঝতে পারি আমার কবিতার অর্থ-
হাত দিয়ে স্পর্শ করি শব্দের আবেগ;
নিঃশব্দ কান্না;

পাতায় পাতায় মৌনতার ব্যাখ্যা-
স্কেচ গুলোতে নিঃশ্চেতন যন্ত্রনা;

আমার কবিতার মাঝে আসলে তুমি কখনোই ছিলে না..”

একটা কবিতা লেখা শেষ করার পর এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব হয়। সেই অনুভুতি আমার কাছে স্বর্গীয় মনে হয় এই কারনে যে, সৃষ্টাও হয়ত বিশ্বজগত সৃষ্টি করার পর একই রকম তৃপ্তি অনুভব করেছিলেন। সম্পূর্ন কবিতাটি শেষ করার পর আলগা ভাবে জুড়ে দিলাম এই কয় লাইন,

“..যেখানে অনস্তিত্বের প্রশ্নই অমূলক নয়,
সেখানে জাগতিক প্রেম নিছকই জৈবিক এক উন্মাদনা;”

ততক্ষনে ৮ টা বেজে গেছে ঘড়িতে, ঘুমের রেশ কাটিয়ে ধীরে ধীরে আড়মোড়া দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে শীতার্ত শহর। আমিও সেই আড়মোড়ার শব্দে সচকিত হয়ে বন্ধ করলাম আমার কবিতা লেখার খাতা।

Advertisements

7 comments

  1. সাদামাটা দিনলিপি। তবে ধীরলয়ে একটি কবিতার জন্মের গল্প বেশ ভালো লেগেছে। অনেক দিন পর এমন সাধারণ কিন্তু অসাধারণ একটি লেখা পড়লাম।
    লেখকের জন্যে শ্রদ্ধা।

    “..যেখানে অনস্তিত্বের প্রশ্নই অমূলক নয়,
    সেখানে জাগতিক প্রেম নিছকই জৈবিক এক উন্মাদনা;”
    – কথাগুলো ভুলতে পারছি না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s