ত্রিকোণমিতির একটা অংক মিলানোর গল্প

উমর

মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় আমাকে রফিক নামের একজন গৃহশিক্ষক অংক করাতেন। পরীক্ষা তখন একেবারে সামনে, তাই সেই অর্থে ধরে ধরে অংক করাতে হতো না, তাই উনি সাধারনত আমাকে কোনো একটা অনুশীলনী ধরিয়ে দিয়ে মহানন্দে বসে বসে মজার মজার গল্প শুনাতেন। আমিও সেই গল্প শুনতাম আর অংক করতাম, কোনো ভুল হলে উনি ঠিক করে দিতেন। এভাবে করতে করতে একটা রুটিনের মতো হয়ে গেল ব্যাপারটা, উনি আসলেই আমি বই খুলে আগের দিনের পর থেকে শুরু করতাম। আর সেই সাথে সমানতালে চলত গল্প।

একদিন ত্রিকোণমিতির একটা অংক করছি, আর স্যার বসে শিক্ষক জীবনের লোমহর্ষক কাহিনীগুলো একের পর এক বলে যাচ্ছেন । তার কোন ছাত্রী প্রেমে পড়ে আত্বহত্যা করেছিলো, কাদের বাসার সবার ডায়বেটিস হওয়ার কারনে সব মিষ্টি উনাকেই সাবাড় করতে হত, কোন ছাত্রকে মসজিদ থেকে মারতে মারতে বাসায় নিয়ে এসেছিলেন, এইসব আর কি! এখন আমার যদ্দুর মনে পড়ে সেই অংকটা দেড় পাতার একটা সমাধান ছিলো। আমি কিছুটা আলসেমির বসে, আর কিছুটা গল্পের কারনে অন্যমনষ্ক হয়ে কয়েকটা সূত্র খাটিয়ে নিজের অজান্তেই দেড় পাতা থেকে কমিয়ে কয়েক লাইনের মধ্যে অংকটা শেষ করে ফেলতে সমর্থ হই। প্রতিদিনই গল্প কিছুটা বাকী থেকে যেতো, তবে অনুশীলনীর অংক সবগুলো ঠিকই করে ফেলতাম আমি।

সেদিনও স্যার কে আমার করা অংকগুলো দেখালাম, উনি দেখে সাইন করে চলে গেলেন। আমিও যথারীতি গর্বের সাথে বই-খাতা বন্ধ করে টেলিভিশনের সামনে বসে গেলাম। পরেরদিন বাসায় এসেই স্যার মহাখুশী। আমাকে বললেন, “বাহ ! এরকম বিশাল একটা অংক এতো সহজে করা যায়, এটাতো আমার মাথায়ই আসেনি ! আমি সাইকেল চালাতে চালাতে চিন্তা করছিলাম, পরে বাসায় যেয়ে বিভিন্ন সমাধানের বই ঘেটে দেখলাম কোথাও এভাবে করা নেই, তোমাকে কে এটা এভাবে করে দিয়েছে?” বিনয়ের সাথে জানালাম, যে অপকর্মটা আমার দ্বারাই সাধিত হয়েছে।
দৃশ্যত স্যার খুব খুশী হলেন এবং একটা কাগজে অংকটা করে দিতে বললেন যাতে তার অন্যান্য ছাত্ররাও এই পদ্ধতির মাধ্যমে অল্প সময়েই সহজে সমাধান করে ফেলতে পারে। আমি খুব সুন্দর করে গোটা গোটা হরফে অংকটা দেখে দেখে খাতা থেকে ঐ কাগজে করে দিলাম, কারন এই সময়ের মধ্যেই আমি নিয়মটা ভুলে গেছি। যখন এটা করছি তখনও স্যারের উচ্ছ্বাসের মাত্রা এতটুকুও কমেনি, তিনি বলেই যাচ্ছেন কিভাবে তিনি এই কাগজটা সবাই কে দিবেন, আমার কথা সবার কাছে গল্প করবেন আর আমার কারনে সবাই কতটা উপকৃত হতে যাচ্ছে এইসব। কারন আমরা নিশ্চিত জানতাম অংকটা পরীক্ষায় আসবে এবং আমার নিয়মে না করলে অনেকেই সমাধান করতে ব্যর্থ হবে।

পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে দেখি অংকটা সত্যি সত্যিই এসেছে। আমি পেন্সিল দিয়ে মার্ক করে একটা একটা করে অংক করা শুরু করলাম। সবসময়ই অংক পরীক্ষায় বীজগনিত আর জ্যমিতি করার পর একেবারে শেষ মুহুর্তে ত্রিকোণমিতি করতাম আমি।সেভাবেই বীজগনিত আর জ্যমিতির পর ত্রিকোণমিতি একটা একটা করে করতে করতে শেষ অংকের আগে সেই বিখ্যাত অংকে হাত দিয়ে সমাধান করতে গিয়ে আবিষ্কার করি সূত্র ওলোটপালট হয়ে গেছে। এখন সূত্রটা বের করতে না পারলে কিছুতেই এই পদ্ধতিতে করা যাবে না। তখন সময় আছে আধা ঘন্টার মত, সময় বাঁচাতে আমি পরের অংকটা আগে করে ফেললাম। এখন হাতে সময় আছে মাত্র পনেরো মিনিট, আমি রিভিশন দিবো, না অংকটা করব? যদি অংকটা করি রিভিশন দেয়ার সময় পাওয়া যাবে না, আর এই অংকটা না করে ছেড়ে দিলে স্যার কে-ই বা কি বলব?

আমার অহম আমাকে বাধ্য করলো যেকোনোভাবে অংকটা করে প্রয়োজনে রিভিশন ছাড়াই খাতা জমা দিতে। আবার শুরু করলাম সূত্র কিছুতেই মনে পড়লো না আর হিসাব করে বের করার মতো সময়ও হাতে নেই তখন। নিরুপায় হয়ে পুরোনো সেই জটিল পদ্ধতিতে আবার নতুন করে করা শুরু করলাম, অর্ধেকটা ঠিকমতো করে যেই বুঝতে পারি আর মাত্র পাঁচ মিনিট আছে, কোনো রিভিশন না দিয়েই আমাকে খাতা জমা দিতে হবে তখনি আমার মাথা গুলিয়ে গেলো।

খাতা জমা দেয়ার ঠিক আগের মুহুর্তে আমাকে নিতে আসা বাদল ভাই আমাদের হলের সামনে দাড়িয়েছিলেন। পরীক্ষার্থীদের নিতে আসা লোকজন দের হলে আসার ব্যপারে কড়াকড়ি থাকলেও পুলিশের পোষাক পড়ে আসার কারনে তাকে কেউ বাধা দেয়নি।উনি দেখলেন আমি কলম দিয়ে সক্রোধে শেষের একটা পাতা কেটে খাতা জমা দিলাম। দেখা হলে আন্তরিক হাসি দিয়ে জিজ্ঞেশ করলেন, “ভাইয়া, একটা অংক মনে হয় মেলাতে পারেন নাই।” আমি বললাম, “নাহ! কোনো ভাবেই পারলাম না, আর কখনো পারব-ও না।”

(ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য করুণ এই স্মৃতি কলেজ জীবনের এক শিক্ষককে বলেছিলাম। উনি হেসে আমাকে সাবধান করেছিলেন, যাতে এই ঘটনা আমি থেকে কিছুটা হলেও শিক্ষা নেই। তবে আমি তা করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছি এবং তার মাশুল হিসেবে এরকম ঘটনা আমার জীবনে বিভিন্ন ভাবে বার বার ঘটেছে।)

Advertisements

13 comments

  1. অঙ্ক নিয়ে আমার অনেক ভয়ঙ্কর ঘটনা আছে তবে আপনার লেখাটা পড়ে অনেক মজা পেলাম। মানে দুঃখও হল আবার মজাও পেলাম।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s