“স্বপ্ন দেখতে চাই, স্বপ্নের হাতে নিজেকে ধরা দিতে চাই”

“শব্দে বাধি ঘর –
আমি দুঃস্বপ্নের ভেতর,
যা শুনি সবই পরিহাস,
তবু স্বপ্নে করি বাস;”

স্বপ্ন দেখেনা এমন মানুষ এই দুনিয়ায় নেই, অন্তত আমার চোখে এমন কেউ পড়েনি এখনও ।আমাদের চারপাশের বেশীরভাগ মানুষই আসলে স্বপ্নবিলাশী। আর যারা স্বপ্ন দেখতে পারে না, তারাই শেষে হতাশাবাদীদের দলে নিজেদের নাম লেখায়। আপনি যদি একদল অবসাদ্গ্রস্থ মানুষের সাথে কথা বলেন, তাহলে দেখবেন তাদের কোনও স্বপ্ন বা আশা নেই। মনে হয়, স্বপ্ন দেখার অপারগতাই আমাদের মনে অবসাদের অনুভুতির জন্ম দেয়। স্বপ্নই সুখ আর সমৃদ্ধির পথে আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলে, আমাদের প্রেরনা যোগায়।

পহেলা বৈশাখে উপলক্ষ্যে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিলো আমাদের বাসায়। ২০০৯ সালের কথা, তারিখটা অবশ্যই ১৪ই এপ্রিল। আমাদের সারা বাড়ীর মেঝে, দরজার চৌকাঠ, আর সিড়িতে আমার মা নিজ হাতে আলপনা এঁকেছিলেন। পুরো দিনব্যপী সেই অনুষ্ঠানে সপরিবারে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বন্ধু, শুভাকাঙ্খী, প্রতিবেশীরা সহ বাবার কর্মস্থলের প্রায় সকল স্তরের কর্মচারীবৃন্দ। প্রায় সব বয়সের অতিথির জন্যই সেখানে ছিলো কোনও না কোনও মজার খেলা, আর শেষে ছিলো পুরস্কার। সব খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর অফিস ও বাসার স্টাফদেরকে নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিলো একটি বিশেষ লটারীর। নিয়ম ছিলো এরকম যে, একটা বাক্সের মধ্যে অনেকগুলো কাগজের টুকরা থাকবে। সেখান থেকে সবাই একটা করে কাগজ তুলবে, সেই কাগজে যা লেখা থাকবে তাকে তাই করতে হবে। তাদেরকে এটাও বলে দেয়া হয়েছিলো যে, আজকে যেহেতু উৎসবের দিন, এখানে যা করা হচ্ছে তা নির্দোষ মজা করার উদ্দেশ্যেই। তাই সংকোচ করার কিছু নেই। বার বার অভয় দেয়ার পরও অনেকেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলো প্রথমদিকে। বলাই বাহুল্য যে, সেখানে ছিলো খুবই সাধারন কিছু প্রশ্ন, অথবা সহজ কিছু ধাঁধাঁ, যা অনুষ্ঠানটিকে আরও উপভোগ্য করে তুলবে। প্রথমদিকে কিছুটা জড়তা থাকলেও পরে সকলের অংশগ্রহনে খেলাটি বেশ জমে ওঠে। একজনকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “তার মুদ্রাদোষ কি?” সরল চোখে সে উত্তর দিয়েছিলো, “স্যার, কই তেরি না!” । আরেকজন অভিনয় করে দেখিয়েছিলো, তার উর্ধতন কর্মকর্তা রেগে গেলে কিভাবে তাকে বকা দেন তা। নাচ, গান, কবিতা, ছড়া কিছু বাদ গেলো না, সবই হলো। একেবারে শেষ কাগজটি তুলেছিলো অফিসের ঝাড়ুদার প্রদীপ। তাতে ছিলো ছোট্ট একটা জিজ্ঞাসা, “তোমার স্বপ্ন কি?” এক মুহুর্তও না চিন্তা করে সে উত্তর দিয়ে দিলো, “আমার স্বপ্ন এই দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া”। সবাই তো অবাক ! ব্যাটা বলে কি ? উদ্ভট আর অলীক স্বপ্নের, এহেন সহজ স্বীকারোক্তি! এটা যদি অন্য কেউ বলতো তাহলে ভাবনার অবকাশ ছিলো, সম্ভাব্যতা নিয়েও কথা উঠে যেতো। তার তুলনা হয়ত দেয়া হতে পারতো আব্রাহাম লিঙ্কন কিংবা কোনও বড় মনীষীর সাথে, সাধুবাদ তো থাকতোই। মানুষ আশাবাদী, তাই আশীর্বাদও জুটে যেত অনেক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে, কোনও হিসেব নিকেশের প্রয়োজন নেই। বাস্তবতার সমীকরনে এর অবস্থান অসম্ভবেরও পরে। স্বপ্নটা যেন সে দেখতে পারে বলেই দেখা।

আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে, আমি তখন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। আমরা কিছু বন্ধুরা মিলে ক্লাস শেষে আড্ডা দিচ্ছিলাম, হঠাৎ এক বড়ভাই এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, আমরা কিরকম ফলাফল প্রত্যাশা করছি। ভ্যবাচেকা খেয়ে আমরা সবাই একই সুরে প্রায় একই উত্তর দিলে, উনি স্মিত হেসে বলেছিলেন, “তোমার যদি একটা রকেট থাকে। এবং যদি তুমি এটাকে নিয়ে মহাকাশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখ, আর সে লক্ষ্য নিয়ে এগুতে থাকো, তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারো এই রকেট অন্তত পৃথিবীর আকাশসীমা পর্যন্ত যাবে। আর যদি তেমন কোনও স্বপ্ন বা প্রচেষ্টা না থাকে, ভাগ্য খুব বেশী ভালো হলে- না বুঝেই হয়ত কোনও একদিন রকেটকে উড়াতে সক্ষম হবে, কিন্তু কোনও ভাবেই এর বেশী কিছু করা সম্ভব হবে না। যদি না তার উড়া  তোমাকে উচ্চাভিলাষী করতে না পারে ।”

মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। আকাশ কুসুম স্বপ্ন, একেবারে কোনও আগা মাথা ছাড়া স্বপ্ন। তাই জীবনের শূন্যতার প্রকোপে যখন সব কিছু নিরর্থক মনে হয়, তখনি মানুষ স্বপ্ন বুনে আসলে নিজেকেই নিজে সান্তনা দেয়, ভবিষ্যতের ব্যপারে নিজেকে আস্বস্ত করে। বর্নবাদের বিষাক্ত ছোবলে লাঞ্ছিত নিপীড়িত লাখো জনতার সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাই মহা কাব্যিক উচ্চারনে নেতা  ঘোষনা করেন, “i have a dream..”। বরিশালের অখ্যাত এক ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক দারিদ্র, অশান্তি, আর সমস্ত অপারগতা ঝেড়ে ফেলে কাগজ কলম নিয়ে লিখে ফেলেন আশাপ্রদায়ী একটি কবিতার কিছু লাইন,

“পৃথিবীর বাধা —
এই দেহের ব্যাঘাতে, হৃদয়ে বেদনা জমে —
স্বপনের হাতে আমি তাই,
আমারে তুলিয়া দিতে চাই।
যেই সব ছায়া এসে পড়ে,
দিনের রাতের ঢেউয়ে —
তাহাদের তরে, জেগে আছে আমার জীবন;
সব ছেড়ে আমাদের মন, ধরা দিত যদি এই স্বপনের হাতে!
পৃথিবীর রাত, আর দিনের আঘাতে,
বেদনা পেত না তবে কেউ আর – থাকিত না হৃদয়ের জরা –
সবাই স্বপ্নের হাতে দিত যদি ধরা!”

আমিও বাস্তবতার পেষনে নিজে কে পিষ্ট হতে দিতে চাই না,  সমস্ত হতাশা ঝেড়ে  একান্তে  জানালার পাশে       বসে     স্বপ্ন বুনতে চাই।                                  স্বপ্নের হাতে নিজেকে  ধরা  দিতে চাই।

——— ফুটনোটঃ ———
১। শুরুর কবিতাটি আমার নিজের লেখা।
২। মার্টিন লুথার কিং, একজন বিখ্যাত আফ্রিকান-আমেরিকান মানবাধিকার কর্মী। ১৯৬৩ সালে ওয়াশিংটন অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচীতে তার প্রদত্ত ঐতিহাসিক এই ভাষনটি কৃষ্ণাঙ্গদের স্বাধীকার আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছিলো।
৩। বরিশালের ব্রজমোজন কলেজে ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক ছিলেন জীবনানন্দ দাশ, যিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম, বরিশালে থাকা অবস্থাতেই পত্রিকায় ১৯৩৫ সালে তার বহুল আলোচিত বনলতা সেন ও ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, উল্লিখিত কবিতাটি ধূসর পাণ্ডুলিপি থেকে নেওয়া।http://www.bangla-shahitto.com/স্বপ্নের-হাত.html

Advertisements

2 comments

  1. কবিতাটা গ্রেট। আর স্বপ্ন কি শুধু সত্যি করবার জন্যই? অলীক কিছু কেন স্বপ্নে থাকবে না? স্বপ্ন তো স্বপ্নই। যেটা করতে পারব না, সেটাই স্বপ্ন। -এটা আমার অভিমত!
    এনিওয়ে, আমার পোস্টে কমেন্টের জন্য ধন্যবাদ!

    • ধন্যবাদ, গোধূলি ! হ্যা, স্বপ্ন শুধু সত্যি করার জন্যে না, অনেক স্বপ্নই অলীক। তবে অলীক স্বপ্ন-ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তব হয়ে যেতে পারে, এরকম স্বপ্নই দেখা উচিত আমাদের। 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s